বাচ্চাদের মোবাইল আসক্তি কেন বাড়ছে? কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করবেন? জানুন চিকিৎসকের মতামত
এক সময় বিকেল মানেই ছিল মাঠে খেলাধুলা, পাড়ার বন্ধুদের সঙ্গে দৌড়ঝাঁপ, কখনো বা লুকোচুরি। আজ সেই বিকেল বদলে গেছে। অনেক বাড়িতেই দেখা যায়, স্কুল থেকে ফিরে বাচ্চা সোজা মোবাইল হাতে নিয়ে বসে পড়ছে। কেউ গেম খেলছে, কেউ ভিডিও দেখছে, কেউ আবার সারাক্ষণ স্ক্রল করছে। খাওয়া, পড়াশোনা, ঘুম সবকিছুতেই ঢুকে পড়েছে মোবাইল।
এই ছবি শুধু শহরের ফ্ল্যাটে নয়, গ্রামেও এখন পরিচিত। প্রশ্ন উঠছেই, কেন এত কম বয়সে বাচ্চারা মোবাইলের প্রতি এতটা আসক্ত হয়ে পড়ছে। এটা কি শুধু সময়ের দোষ, না কি আমাদের অজান্তেই কিছু ভুল হচ্ছে। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, কীভাবে এই আসক্তি নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
এই প্রতিবেদনে শিশু চিকিৎসক ও মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের মতামত, অভিভাবকদের বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং ভারতীয় সমাজের প্রেক্ষাপটে সমস্যার গভীর দিক তুলে ধরা হল।
বাচ্চাদের মোবাইল আসক্তি আসলে কী
মোবাইল আসক্তি মানে শুধু বেশি সময় মোবাইল ব্যবহার করা নয়। চিকিৎসকদের মতে, যখন কোনো শিশু মোবাইল ছাড়া অস্থির হয়ে পড়ে, মোবাইল কেড়ে নিলে রাগ করে, পড়াশোনা বা খেলাধুলার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলে, তখন সেটি আসক্তির পর্যায়ে পড়ে।
অনেক বাবা মা বলেন, মোবাইল না দিলে বাচ্চা খেতে চায় না। আবার কেউ বলেন, মোবাইল ছাড়া বাচ্চা ঘুমোতেই পারে না। এই নির্ভরশীলতাই আসক্তির প্রথম লক্ষণ।
কেন এত দ্রুত বাড়ছে বাচ্চাদের মোবাইল আসক্তি
চিকিৎসকদের মতে, এই সমস্যার পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে।
বাড়ির পরিবেশের পরিবর্তন
আগে যৌথ পরিবারে বাচ্চারা দাদু দিদা, কাকু জেঠুদের সঙ্গে সময় কাটাত। এখন বেশিরভাগ পরিবার নিউক্লিয়ার। বাবা মা দুজনেই কাজ করেন। ফলে বাচ্চা একা হয়ে পড়ে। তাকে ব্যস্ত রাখতে অনেক সময় সহজ সমাধান হিসেবে হাতে তুলে দেওয়া হয় মোবাইল।
অনলাইন পড়াশোনার প্রভাব
করোনার সময় অনলাইন ক্লাস বাচ্চাদের জীবনে মোবাইল ও ট্যাবলেটের ব্যবহার স্বাভাবিক করে দিয়েছে। পড়াশোনার জন্য শুরু হলেও ধীরে ধীরে সেই ডিভাইসেই ঢুকে পড়েছে গেম ও বিনোদন।
চিকিৎসকদের মতে, ছোট বাচ্চাদের ক্ষেত্রে এই সীমারেখা বোঝা কঠিন। পড়াশোনা আর বিনোদনের পার্থক্য তাদের কাছে স্পষ্ট হয় না।
বাবা মায়ের অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহার
শিশু বিশেষজ্ঞরা বলেন, বাচ্চারা শেখে অনুকরণ করে। যদি বাবা মা সারাক্ষণ মোবাইল হাতে থাকেন, তাহলে বাচ্চারাও সেটাকেই স্বাভাবিক মনে করবে।
অনেক বাড়িতে দেখা যায়, একসঙ্গে বসে খাওয়ার সময়ও বাবা মা ফোন দেখছেন। সেখানে বাচ্চাকে মোবাইল থেকে দূরে রাখা কার্যত অসম্ভব।
সহজ আনন্দ ও তৎক্ষণাৎ উত্তেজনা
মোবাইল গেম, ভিডিও বা কার্টুন বাচ্চাদের মস্তিষ্কে দ্রুত আনন্দের অনুভূতি তৈরি করে। চিকিৎসকদের ভাষায় একে বলা হয় তৎক্ষণাৎ তৃপ্তি।
খেলাধুলা বা বই পড়তে সময় লাগে, ধৈর্য লাগে। কিন্তু মোবাইলে এক ক্লিকেই আনন্দ। ফলে বাচ্চারা সহজ পথ বেছে নিচ্ছে।
ছোট বয়সে মোবাইল আসক্তির মানসিক প্রভাব
শিশু মনোবিদদের মতে, মোবাইল আসক্তির প্রভাব শুধু চোখ বা শরীরের ওপর নয়, মনের ওপরও গভীর।
মনোযোগের সমস্যা
যে বাচ্চা সারাক্ষণ দ্রুত বদলে যাওয়া ভিডিও দেখে অভ্যস্ত, তার পক্ষে বইয়ের পাতায় মন বসানো কঠিন হয়ে যায়। স্কুলে পড়াশোনায় মনোযোগ কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ এটি।
আচরণগত পরিবর্তন
অনেক অভিভাবক লক্ষ্য করেন, মোবাইল কেড়ে নিলে বাচ্চা অস্বাভাবিক রেগে যায়, চিৎকার করে বা জিনিস ছুঁড়ে ফেলে। চিকিৎসকদের মতে, এটি আসক্তির স্পষ্ট লক্ষণ।
সামাজিক বিচ্ছিন্নতা
মোবাইলে অভ্যস্ত বাচ্চারা ধীরে ধীরে বাস্তব বন্ধুদের থেকে দূরে সরে যায়। তারা একা থাকতে পছন্দ করে, কথা কম বলে।
শারীরিক সমস্যার আশঙ্কা
শুধু মানসিক নয়, শারীরিক দিক থেকেও মোবাইল আসক্তি ক্ষতিকর।
চোখের সমস্যা, মাথাব্যথা, ঘুমের ব্যাঘাত, স্থূলতা এই সব সমস্যা ধীরে ধীরে দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে রাতে ঘুমানোর আগে মোবাইল ব্যবহার করলে ঘুমের স্বাভাবিক ছন্দ নষ্ট হয়।
শিশু চিকিৎসকদের মতে, ঠিকমতো ঘুম না হলে বাচ্চার বৃদ্ধি ও শেখার ক্ষমতা প্রভাবিত হয়।
চিকিৎসকেরা কী বলছেন
শিশু মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, মোবাইল পুরোপুরি বন্ধ করা সমাধান নয়। বরং নিয়ন্ত্রিত ব্যবহার শেখানোই আসল।
তাঁদের মতে, পাঁচ বছরের নিচে বাচ্চাদের ক্ষেত্রে যতটা সম্ভব স্ক্রিন এড়ানো উচিত। স্কুলগামী বাচ্চাদের জন্য নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দেওয়া জরুরি।
একজন শিশু চিকিৎসকের কথায়, মোবাইলকে পুরস্কার বা শাস্তির মাধ্যম বানালে সমস্যা আরও বাড়ে। এতে বাচ্চার মনে মোবাইলের গুরুত্ব বেড়ে যায়।
কীভাবে ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণ করবেন
মোবাইল আসক্তি একদিনে তৈরি হয়নি, তাই একদিনে বন্ধও হবে না। ধাপে ধাপে এগোতে হবে।
সময় বেঁধে দিন
দিনে কতক্ষণ মোবাইল ব্যবহার করা যাবে, সেটা বাচ্চাকে জানিয়ে দিন। এই নিয়মে বাবা মাকেও চলতে হবে।
বিকল্প অভ্যাস গড়ে তুলুন
খেলাধুলা, আঁকা, গল্পের বই পড়া এই সব কাজে বাচ্চাকে যুক্ত করুন। শুরুতে সে আগ্রহ না দেখালেও ধৈর্য ধরতে হবে।
একসঙ্গে সময় কাটান
বাচ্চারা মোবাইলের দিকে ঝোঁকে কারণ তারা একা বোধ করে। প্রতিদিন অন্তত কিছু সময় শুধু বাচ্চার সঙ্গে গল্প করুন, খেলুন।
শোবার আগে মোবাইল বন্ধ
চিকিৎসকদের মতে, ঘুমানোর অন্তত এক ঘণ্টা আগে মোবাইল বন্ধ রাখা উচিত। এই নিয়ম পুরো পরিবারের জন্য প্রযোজ্য হলে ভালো ফল পাওয়া যায়।
গ্রাম ও শহরের অভিভাবকদের অভিজ্ঞতা
কলকাতার এক স্কুল শিক্ষিকার কথায়, আগে তিনি পড়াশোনার জন্য বাচ্চাকে মোবাইল দিতেন। পরে দেখেন, বাচ্চা পড়ার নাম করে ভিডিও দেখছে। এখন নির্দিষ্ট সময়ে টেবিলের সামনে বসে পড়াশোনার নিয়ম করেছেন।
একই রকম অভিজ্ঞতা নদিয়ার এক গ্রামের অভিভাবকেরও। তাঁর মতে, গ্রামেও এখন মোবাইল ছাড়া বাচ্চাদের রাখা কঠিন। তবে মাঠে খেলতে পাঠালে ধীরে ধীরে মোবাইলের আগ্রহ কমছে।
বাবা মায়ের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ
চিকিৎসকেরা একমত, বাচ্চাদের মোবাইল আসক্তি নিয়ন্ত্রণের চাবিকাঠি বাবা মায়ের হাতেই। শুধু নিষেধাজ্ঞা দিয়ে নয়, নিজের আচরণ বদলেই শুরু করতে হবে।
যে বাড়িতে কথা বলা, একসঙ্গে খাওয়া, গল্প করার পরিবেশ আছে, সেখানে মোবাইলের প্রভাব তুলনামূলক কম।
ভবিষ্যতের জন্য সচেতনতা জরুরি
মোবাইল প্রযুক্তি আমাদের জীবনের অংশ। বাচ্চাদের পুরোপুরি এর থেকে দূরে রাখা বাস্তবসম্মত নয়। কিন্তু নিয়ন্ত্রণ না করলে এর ক্ষতি দীর্ঘমেয়াদে মারাত্মক হতে পারে।
আজ যদি আমরা সচেতন না হই, তাহলে আগামী দিনে মানসিক ও সামাজিক সমস্যায় ভুগতে পারে একটি পুরো প্রজন্ম।
উপসংহার
বাচ্চাদের মোবাইল আসক্তি শুধু একটি অভ্যাসের সমস্যা নয়, এটি সময়ের প্রতিফলন। তবে চিকিৎসকদের মতে, সচেতন অভিভাবকত্ব দিয়ে এই সমস্যাকে অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
ভালোবাসা, সময় এবং ধৈর্য এই তিনটি জিনিসই এখানে সবচেয়ে বড় ওষুধ। মোবাইল নয়, সম্পর্কই বাচ্চাদের আসল নিরাপত্তা।
Know more news: Winter Skin Care: শীতে ত্বকের যত্ন কীভাবে নেবেন বড়দিনের আগে উজ্জ্বল ত্বক পেতে সম্পূর্ণ গাইড

হ্যালো! আমি Samapti, একজন ক্রিয়েটিভ কনটেন্ট নির্মাতা এবং ডিজিটাল স্টোরিটেলার। আমি আইডিয়াগুলোকে এমনভাবে উপস্থাপন করতে পছন্দ করি, যাতে কেবল তথ্যপূর্ণ নয়, পাঠকের জন্য আকর্ষণীয় এবং সহজে বোধ্যও হয়।

2 Comments