দুর্গাপূজা ২০২৬: ২০২৬ সালের দূর্গা পূজা কবে, তারিখ, রীতি ও সাংস্কৃতিক মহিমা
উত্তর থেকে দক্ষিণ, শহর থেকে গ্রাম- সবখানে মায়ের অনুষ্ঠান
ভারতের সেই সব উৎসবের মধ্যে দুর্গা পূজা এক বিশেষ স্থান অধিকার করে আছে, যা শুধু একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, বরং সমগ্র বাঙালি সমাজের আবেগ, সংস্কৃতি ও জীবনের সংমিশ্রণ। কলকাতা হোক বা জয়নগর, দিঘা হোক বা মালদহ, এই উৎসবের ছোঁয়া সব জায়গায় একই অনুভূতি জাগায়।
২০২৬ সালের দুর্গা পূজা আগামী বছরে আবারো একই ঐতিহ্য আর আবেগের স্রোত বহন করবে। কিন্তু তারিখ থেকে শুরু করে রীতি, সম্বন্ধ, মাহাত্ম্য—এসব জিনিস কেবল একটি পণ্ডাল পরিক্রমা নয়, এটি বাঙালির জীবনধারা, আত্মিক চেতনা এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।
এই ব্লগে আমরা ২০২৬ সালের দুর্গা পূজাকে কেন্দ্র করে তারিখ, সময়, রীতি এবং তার সাংস্কৃতিক মহিমা বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করবো, একেবারে মানবিক ভাষায়, বাঙালি পাঠকদের জন্য।
২০২৬ সালের দুর্গা পূজার তারিখ এবং সময়
প্রতি বছর আশ্বিন মহিনীর শুক্লা পক্ষের ষষ্ঠী তিথি থেকে দশমী পর্যন্ত চলে দুর্গা পূজা। ২০২৬ সালে দুর্গা পূজার মূল অনুষ্ঠানগুলো ধারাবাহিকভাবে অনুষ্ঠিত হবে।
২০২৬ সালের দুর্গাপূজার বিস্তারিত সময়সূচি:
মহালয়া (দেবীপক্ষের শুরু): ১০ অক্টোবর, শনিবার
মহা ষষ্ঠী: ১৭ অক্টোবর, শনিবার (পূজা শুরু)
মহা সপ্তমী: ১৮ অক্টোবর, রবিবার
মহা অষ্টমী: ১৯ অক্টোবর, সোমবার
মহা নবমী: ২০ অক্টোবর, মঙ্গলবার
বিজয়া দশমী : ২১ অক্টোবর, বুধবার
এই তারিখগুলো হলো মূল ধারার পুজোর সময়, যা পন্ডালপ্রেমী, সংস্কৃতিপ্রেমী ও ভক্তদের জন্য আরো নির্দিষ্ট করে দিয়েছে পুজোর ছন্দ। সকাল থেকে সন্ধ্যা অবধি প্রতিদিন নির্দিষ্ট তিথিগুলোর পূজা ও আচারের নিয়ম থাকে।
এক্ষেত্রে শুধু দিন হিসাব করলেই হবে না, তিথি, নক্ষত্র, শুভ সময়—এসব মিলিয়ে পূজার সময়সূচি বানানো হয়। তাই পঞ্চাঙ্গ বা পঞ্জিকা বিশেষজ্ঞরা পুরো অনুষ্ঠানটি সূক্ষ্মভাবে ঘোষণা করেন।
দুর্গা পূজার রীতি ও আচারের বিশদ বিবরণ
দূর্গা পূজা বহু মাত্রার উৎসব। এটি শুধু দেবী দূর্গার আরাধনা নয়, এটি বাঙালির জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক অপরিহার্য সংস্কৃতি।
১। ষষ্ঠী দিবস: মা এসেছেন
ষষ্ঠী তিথিতে শুরু হয় পূজার আনুষ্ঠানিকতা। এই দিনটিকে মনে করা হয় যখন দেবী দুর্গা পৃথিবীতে আগমন করেন।
গ্রামীণ বাংলায় ষষ্ঠীর দিন পুজোর শুরু হয় সকাল থেকেই। প্যান্ডেল আর মণ্ডপ সাজানো হয় আগেই, কিন্তু সকাল বেলা দেবীর প্রতিমা স্থাপন এবং প্রধান আরতি—এসবেই পূজার আসল সূচনা।
ছেলে-মেয়ে, যুবক-বৃদ্ধ—সবাই মিলে প্যান্ডেল পরিক্রমা শুরু করেন। পুজোর মণ্ডপগুলি একেকটি অদ্ভুত সৌন্দর্য ও নির্মাণশৈলীতে দেখা যায়। কখনও হতে পারে গ্রামোষ্ঠলীর থিম, আবার কখনও শহুরে আধুনিক আর্ট ফর্ম।
এই দিনটিতে বিশেষ করে ষষ্ঠীর মধ্য রাত্রির সময় ঝাঁপিয়ে পরা গোবর ঢালা, মাটি, কাপড়, কাঠের কাজ—এসব পূজা সংশ্লিষ্ট প্রসাধন শুরু হয়।
২। সপ্তমী: গান-বাজনা আর সাংস্কৃতিক মিলন
সপ্তমী তিথিতে প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে ভক্তির শোভা বৃদ্ধি পায়। প্রতিমার সামনে বাজে ঢাক, ধোল-ধামাই, ধুপি-দানি—সব মিলিয়ে তৈরি হয় এক অনন্য পরিবেশ।
বাংলার গ্রামে গ্রামে সপ্তমীর দিন শুরু হয় সাংস্কৃতিক কর্মসূচি দিয়ে। স্কুল-কলেজগুলোর ছাত্রী-ছাত্রীরা নৃত্য, সংগীত পরিবেশন করে। রবীন্দ্র সংগীত থেকে লোকগান, সব মিলিয়ে পূজার গৃহীত সাংস্কৃতিক শুভেচ্ছা ছড়িয়ে পড়ে।
সপ্তমীর অন্যতম আকর্ষণ হল সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত ঘুরে বেড়া অনুষ্ঠানের আয়োজন। পাড়া-প্রতিবেশীদের ঘুরে ঘুরে শুভেচ্ছা বিনিময়, এই মিলন বাঙালির অনন্য বিবেসনা।
৩। অষ্টমী: চণ্ডী পাঠ ও শক্তি আরাধনা
দূর্গা পূজার অন্যতম প্রধান দিন অষ্টমী। এই দিনটি অতি পবিত্র, কারণ চণ্ডী পাঠ, দুর্গা ষষ্ঠী থেকে দশমী পর্যন্ত সমস্ত আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে অষ্টমী সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
চণ্ডী পাঠ অর্থাৎ দেবী দুর্গার মহিমা চণ্ডীপাঠ করা হয়। গ্রামের মন্দির থেকে শুরু করে শহরের বড় বড় প্যান্ডেলে পাঠ হয়। যারা পড়েন, তাঁরা সাধারণত পূজার আগে নির্দোষ বস্তু ও বিশুদ্ধতা গ্রহণ করেন।
অষ্টমীর পূজায় থাকে যজ্ঞ, হোম, ধুপ-দানি, লাল ফুলাদি সাজানো, দেবীর সামনে সব শ্রদ্ধা নিবেদন। এই দিনে ভক্তরা দীর্ঘক্ষণ আরতি করে থাকে।
৪। নবমী: শক্তি সংহার এবং পুনর্বাসনের প্রস্তুতি
নবমী তিথি হল পূজার শেষদিনের প্রস্তুতি। দেবী দুর্গা যেন সমস্ত শক্তি ঐ দিনে ভাণ্ডারে মুছেন, এবং পরের দিন অগ্নিদেবতায় ফিরে যাওয়ার পথ তৈরি করেন।
এই দিনে ভক্তরা দেবীর কাছে প্রার্থনা করেন সকল বিপদ, রোগ-অসুখ কাটিয়ে আবারো সামনের দিন শুভ সূচনা হোক, এটি নিয়েই এই তিথি অর্থপূর্ণ।
দূর্গা পূজার সাংস্কৃতিক মহিমা
দূর্গা পূজা শুধুই ধর্মীয় আচার নয়, এটি বাংলার সাংস্কৃতিক আত্মার এক অমোঘ অংশ। পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় এই উৎসবের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। কলকাতা, আমদাবাদ থেকে শুরু করে গ্রামীণ অঞ্চলে পর্যন্ত প্রতিটি জেলায় এই অনুষ্ঠানের নিজস্ব বৈচিত্র্য।
১। শিল্প ও নির্মাণশৈলী
দূর্গা পূজার মণ্ডপ নির্মাণ এক শিল্পকর্ম। কাঠ, মাটি, কাপড়, বাঁশ—এই সাধারণ উপকরণ দিয়েই শিল্পীরা তৈরি করেন বিশাল প্রতিমা ও দালান। কখনও দেখবেন ধানক্ষেতের শাওলি দিয়ে সাজানো মণ্ডপ, আবার কখনও শিল্পীরা মেটাল, ফাইবার বা অন্য আধুনিক উপকরণ দিয়ে তৈরি করেছেন অভাবনীয় স্থাপত্য।
কলকাতা শহরে প্যান্ডেল হল পর্যটকদের আকর্ষণ। দক্ষিণেশ্বর থেকে শ্যামবাজার—প্রতিটি প্যান্ডেল নিজস্ব থিম ও কাহিনি ফুটিয়ে তোলে।
২। পিঠাপুলি ও মিষ্টান্নের বৈচিত্র্য
দূর্গা পূজায় শুধু আরাধনা নয়, খাদ্যও একটি বিশেষ স্থান অধিকার করে। দুর্গাপুজোর সময় বাজারে চলে পিঠাপুলির বর্ণাঢ্য মিলন, লুচি, দই-ঝুরি, নারিকেল পিঠা, চিড়া-দই—এসব পরিজনের বাসায় ফেরার আনন্দে ভাগ করা হয়।
শহর-গঞ্জে বাঙালি পরিবারগুলো একসঙ্গে মিলেমিশে পিঠার আয়োজন করে, এবং নতুন স্বাদের মিষ্টান্ন তৈরি হয়। পুজোর সময় তৈরি হওয়া মিষ্টি ও পিঠা, বাঙালির ঐতিহ্যের এক অঙ্গ।
৩। পরিবার ও সমাজে মিলন
দূর্গা পূজা মানেই পরিবার-পরিজন, বন্ধুবান্ধব সবাই একসঙ্গে মিলিত হওয়া। গ্রামে পাড়ায় বিভিন্ন মিলন মেলায় দেখা যায় মানুষ একে অপরের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করছে, মিষ্টি আদানপ্রদান করছে, হাত ধরাধরি করে মণ্ডপ ঘুরছে।
শহরের ফ্ল্যাটবাড়ি থেকে শুরু করে ছোটপাড়া সব জায়গাতেই দুর্গা পূজা সমাজের মানুষকে একত্রিত করে। বেদে বা যাত্রা নাট্যদলগুলোর পরিবেশনা, রাস মঞ্চ, সব মিলিয়ে সামাজিক রঙ দেখা যায়।
দুর্গা পূজা ও অর্থনীতি
পূজা শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, এটি অর্থনৈতিক হিসাবেও বিশাল। বহু মানুষের কাজ এই সময়।
শিল্পীরা মণ্ডপ নির্মাণে ব্যস্ত হন, বিপণিকাররাও নতুন সাজ সাজিয়ে পুজোর বাজার সাজান। বাঙালি বাড়ির লোকজন পুজোর জন্য নতুন কাপড়, উপহার, সৌন্দর্য পণ্য কেনেন।
গ্রামীণ অঞ্চলে এই সময় পাট, তাঁত ও হস্তশিল্পের বিক্রি বেড়ে যায়। পিঠাপুলি ব্যবসায়ীরা পুজোর বিশেষ চাহিদা পূরণ করেন। শহরেও রেস্টুরেন্ট, ফুড ডেলিভারি, ক্যাটারিং, সবকিছুর ব্যস্ততা দেখা যায়।
এটি একটি বহুমুখী অর্থনৈতিক উৎসব, যেটি বছরের বাকি সময়ের তুলনায় বিশেষভাবে সক্রিয়।
দুর্গা পূজা—শৈশব থেকে প্রবীণের স্মৃতি
প্রতিটি বাঙালির জীবনে দুর্গা পূজার আলাদা স্মৃতি থাকে। স্কুলে পুজোর ছুটি, প্যান্ডেলে ঘুরে ফেরা, বন্ধুর সঙ্গে মিষ্টি খাওয়া, এসব ছোট মুহূর্তগুলো একেকজনের মনে গভীর আবেগ তৈরি করে।
প্রবীণরা পুজোকে স্মৃতিচারণার ঘট হিসেবে দেখেন। অনেকেই বলেন, পুজো মানে পূর্বপুরুষদের স্মরণ, জীবনের মূল্য বোঝা, এবং সমাজের সঙ্গে সংযোগ।
উপসংহার
২০২৬ সালের দুর্গা পূজা শুধু তারিখ বা প্যান্ডেল পরিক্রমা নয়। এটি ধর্ম, সংস্কৃতি, সমাজ, অর্থনীতি—সবকিছুর সংমিশ্রণ। ষষ্ঠী থেকে বিজয়া দশমী পর্যন্ত প্রতিটি দিনেই বাঙালির হৃদয়ে বাজে এক ধ্রুপদ সুর—ভক্তি, মিলন, আনন্দ, আবেগ, ইতিহাস ও আধুনিকতার মেলবন্ধন।
এটি সেই উৎসব, যেখানে শুধু দেবী এসেছেন এমনটা মনে করা হয় না এখানে সারা সমাজ, পরিবার ও সংস্কৃতি মিলেই এক মহা আগমন ঘটে।
২০২৬ সালের দুর্গা পূজা যেমন তারিখ, রীতি ও উৎসবের মধ্যে সাজবে, তেমনই বাঙালির মনে স্মৃতির আকর ভরাবে নতুন আনন্দ।
দূর্গা পূজা এটি কেবল পুজো নয়, এটি বাঙালির জীবনের এক বহুমাত্রিক উৎসব।

হ্যালো! আমি Samapti, একজন ক্রিয়েটিভ কনটেন্ট নির্মাতা এবং ডিজিটাল স্টোরিটেলার। আমি আইডিয়াগুলোকে এমনভাবে উপস্থাপন করতে পছন্দ করি, যাতে কেবল তথ্যপূর্ণ নয়, পাঠকের জন্য আকর্ষণীয় এবং সহজে বোধ্যও হয়।
