Jitiya vrat katha

Jitiya vrat katha: সন্তানসুখ ও দীর্ঘায়ুর আশীর্বাদ লাভের পবিত্র ব্রত

ভারতের গ্রাম ও শহরের অগণিত ঘরে এমন কিছু ব্রত আছে, যা শুধুমাত্র ধর্মাচরণের অংশ নয়, বরং মা ও সন্তানের সম্পর্কের এক গভীর আবেগের প্রকাশ। জিতিয়া ব্রত বা জিতিয়া উপবাস ঠিক তেমনই এক পবিত্র আচার, যেখানে একজন মা নিজের সমস্ত কষ্ট, উপবাস ও সংযম উৎসর্গ করেন সন্তানের দীর্ঘায়ু ও সুস্থ জীবনের জন্য।

পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, ঝাড়খণ্ড, পূর্ব উত্তরপ্রদেশ এবং নেপালের তরাই অঞ্চলে এই ব্রত অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে পালিত হয়। বাঙালি সমাজে এটি পরিচিত জিতিয়া ব্রত নামে, আবার কোথাও একে জিউতিয়া বা জিভিতপুত্রিকা ব্রতও বলা হয়।

এই ব্রত শুধু একটি দিনের উপবাস নয়, এটি একটি মায়ের নিঃশব্দ প্রার্থনা, যেখানে শব্দের চেয়ে বিশ্বাস বড় হয়ে ওঠে।

জিতিয়া ব্রতের উৎস ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

পুরাণ ও লোককথা অনুযায়ী, জিতিয়া ব্রতের মূল কথা জড়িয়ে আছে এক মায়ের ত্যাগ ও ধৈর্যের সঙ্গে। বহু প্রাচীনকাল থেকেই এই ব্রতের উল্লেখ পাওয়া যায় লোকমুখে প্রচলিত কাহিনিতে, যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মায়েদের মুখে মুখে বেঁচে আছে।

শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যায় বলা হয়, এই ব্রতের সঙ্গে জড়িয়ে আছেন জীবিতপুত্রিকা দেবী, যিনি সন্তানের প্রাণরক্ষা ও দীর্ঘায়ুর প্রতীক। মা এই ব্রত পালন করে দেবীর কাছে প্রার্থনা করেন, যেন তাঁর সন্তান বিপদ থেকে মুক্ত থাকে এবং সুস্থভাবে বড় হয়ে ওঠে।

গ্রামবাংলার প্রবীণরা বলেন, জিতিয়া ব্রত এমন এক ব্রত, যেখানে ঈশ্বরের চেয়ে মায়ের বিশ্বাস বেশি শক্তিশালী।

কবে পালিত হয় জিতিয়া ব্রত

ভাদ্র মাসের কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী তিথিতে জিতিয়া ব্রত পালিত হয়। সাধারণত মহালয়ার আগে এই ব্রত পড়ে। দিন নির্ধারণের ক্ষেত্রে পঞ্জিকা অনুযায়ী তিথি দেখা হয়।

ব্রতের আগের দিন অর্থাৎ সপ্তমী তিথিতে অনেক মা নিরামিষ আহার করেন এবং ব্রতের প্রস্তুতি শুরু করেন। অষ্টমীর দিন সূর্যাস্ত থেকে পরের দিন সূর্যোদয় পর্যন্ত সম্পূর্ণ নির্জলা উপবাস পালন করা হয়।

এই কঠোর উপবাসই জিতিয়া ব্রতের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য।

জিতিয়া ব্রতের নিয়ম ও আচার

জিতিয়া ব্রত অত্যন্ত নিয়মনিষ্ঠ একটি ব্রত। যারা এই ব্রত করেন, তাঁদের জন্য কিছু নির্দিষ্ট বিধিনিষেধ মানা আবশ্যক।

ব্রতের দিন ভোরে স্নান সেরে পরিষ্কার কাপড় পরা হয়। অনেক জায়গায় হলুদ বা সাদা শাড়ি পরার রীতি আছে। এরপর জিতিয়া ব্রত কথা পাঠ বা শ্রবণ করা হয়।

এই ব্রতে জল গ্রহণ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এমনকি দাঁত মাজার সময়ও জল না খাওয়ার চেষ্টা করেন অনেক মা। সারাদিন উপবাসে থেকে সন্ধ্যায় প্রদীপ জ্বালিয়ে দেবীর আরাধনা করা হয়।

পরের দিন সূর্যোদয়ের পরে ব্রত ভাঙা হয়, সাধারণত সন্তানদের মুখ দেখে এবং তাদের দিয়ে জল গ্রহণ করে।

জিতিয়া ব্রত কথার মূল কাহিনি

জিতিয়া ব্রত কথার কেন্দ্রে রয়েছে এক গরিব ব্রাহ্মণ পরিবার ও এক নিষ্ঠাবান মায়ের গল্প। কাহিনি অনুযায়ী, সেই মা দেবীর নির্দেশ মেনে কঠোর উপবাস পালন করেছিলেন, যার ফলে তাঁর সন্তানের প্রাণ রক্ষা পায়।

এই গল্পের মাধ্যমে একটি গভীর বার্তা দেওয়া হয়—মায়ের ধৈর্য, বিশ্বাস ও ত্যাগই সন্তানের সবচেয়ে বড় রক্ষাকবচ।

গ্রামবাংলায় আজও সন্ধ্যাবেলা বাড়ির বয়স্কা মহিলা জিতিয়া ব্রত কথা শোনান, আর চারপাশে বসে থাকে ছোটরা। এই গল্প শুধু ধর্মীয় নয়, এটি নৈতিক শিক্ষার বাহক।

কেন সন্তানসুখ ও দীর্ঘায়ুর সঙ্গে জিতিয়া ব্রতের সম্পর্ক

হিন্দু সমাজে সন্তানের দীর্ঘায়ু ও সুস্থতা মায়ের জীবনের সবচেয়ে বড় প্রার্থনা। জিতিয়া ব্রত সেই প্রার্থনারই প্রতীক।

এই ব্রতের মাধ্যমে মা নিজের শরীরের কষ্ট স্বীকার করে সন্তানের মঙ্গল কামনা করেন। বিশ্বাস করা হয়, এই আত্মত্যাগ দেবীর কৃপা লাভের পথ প্রশস্ত করে।

মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকেও এই ব্রত গুরুত্বপূর্ণ। সন্তানের জন্য মায়ের এই ত্যাগ সন্তানকেও জীবনে দায়িত্ববান ও সংবেদনশীল করে তোলে।

বাঙালি সমাজে জিতিয়া ব্রতের লোকজ রূপ

পশ্চিমবঙ্গের গ্রামাঞ্চলে জিতিয়া ব্রত মানেই এক সামাজিক মিলন। পাড়া প্রতিবেশী মহিলারা একসঙ্গে বসে ব্রত কথা শোনেন, গল্প করেন, নিজেদের জীবনের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেন।

শহরের ফ্ল্যাটবাড়িতেও এই দৃশ্য আজও দেখা যায়। ব্যস্ত জীবনের মাঝেও মায়েরা চেষ্টা করেন অন্তত বিশ্বাসটুকু আঁকড়ে ধরতে।

অনেক কর্মজীবী মা অফিসের কাজ সামলে নির্জলা উপবাস পালন করেন, যা এই ব্রতের প্রতি তাঁদের গভীর শ্রদ্ধার পরিচয়।

বৈজ্ঞানিক ও বাস্তব দৃষ্টিকোণ

আধুনিক দৃষ্টিতে নির্জলা উপবাস নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে। চিকিৎসকরা বলেন, যাঁদের শারীরিক সমস্যা আছে, তাঁদের ক্ষেত্রে সতর্কতা জরুরি।

তবে বাস্তব দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, জিতিয়া ব্রত আসলে সংযম ও মানসিক দৃঢ়তার শিক্ষা দেয়। একটি নির্দিষ্ট সময় নিজের চাহিদা দমন করা মানসিক শক্তি বাড়ায়।

অনেক বিশেষজ্ঞ বলেন, ধর্মীয় উপবাস মানসিক চাপ কমাতে এবং আত্মনিয়ন্ত্রণ শেখাতে সহায়ক হতে পারে, যদি তা শরীরের সীমা মেনে করা হয়।

সময়ের সঙ্গে বদলাচ্ছে কি জিতিয়া ব্রত

সময় বদলেছে, সমাজ বদলেছে। আগের দিনের মতো এখন সব নিয়ম কঠোরভাবে মানা সম্ভব হয় না। অনেক মা জল গ্রহণ করেন, কেউ আবার ফল খান।

তবুও মূল বিশ্বাস অটুট। জিতিয়া ব্রত আজও মায়ের ভালোবাসার প্রতীক হয়ে রয়েছে।

অনেক পরিবারে এখন কন্যাসন্তানের জন্যও এই ব্রত পালিত হচ্ছে, যা সমাজের ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।

জিতিয়া ব্রত ও নারীর আত্মপরিচয়

এই ব্রত নারীর শক্তি ও সহনশীলতার প্রতীক। এটি দেখায়, মা শুধু স্নেহের প্রতিমূর্তি নন, তিনি এক দৃঢ় মনোবলের অধিকারী।

তবে আধুনিক সমাজে এই প্রশ্নও উঠছে—এই ধরনের কঠোর ব্রত কি নারীর ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে না।

এই প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বাস আর স্বাস্থ্যের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাই ভবিষ্যতের পথ।

উপসংহার

জিতিয়া ব্রত কেবল একটি ধর্মীয় আচার নয়, এটি মায়ের নিঃশব্দ সংগ্রাম, বিশ্বাস ও ভালোবাসার গল্প। সন্তানসুখ ও দীর্ঘায়ুর আশীর্বাদ কামনা করে একজন মা যে আত্মত্যাগ করেন, তার কোনও পরিমাপ হয় না।

এই ব্রত আমাদের শেখায়, ভালোবাসা শুধু কথায় নয়, ত্যাগেও প্রকাশ পায়। সময় বদলালেও জিতিয়া ব্রতের মূল আত্মা আজও অটুট—মায়ের প্রার্থনায় সন্তানের ভবিষ্যৎ নিরাপদ রাখা।

ভারতীয় সংস্কৃতিতে তাই জিতিয়া ব্রত আজও শ্রদ্ধা, আবেগ ও বিশ্বাসের এক অমলিন অধ্যায়।

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *