শিশু স্বাস্থ্যের কোন কোন বিষয়ে নজর দেওয়া প্রয়োজন: বাবা মায়ের জন্য সম্পূর্ণ গাইড
শিশু মানেই ভবিষ্যৎ। এই কথাটি আমরা প্রায় সবাই বলি, কিন্তু বাস্তবে সেই ভবিষ্যৎকে গড়ে তোলার দায়িত্ব কতটা গুরুত্ব দিয়ে পালন করি, সেটাই আসল প্রশ্ন। আজকের ব্যস্ত জীবনে বাবা মায়ের হাতে সময় কম, চারপাশে মোবাইল, ফাস্ট ফুড আর চাপের পরিবেশ। এর মাঝেই বড় হচ্ছে আমাদের শিশুরা।
শিশু স্বাস্থ্যের বিষয়টি আর শুধু জ্বর সর্দি বা ওজন বাড়া কমার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। শারীরিক সুস্থতার পাশাপাশি মানসিক, সামাজিক এবং আচরণগত স্বাস্থ্যের দিকেও নজর দেওয়া এখন সমান জরুরি।
শিশুর শারীরিক স্বাস্থ্য: ভিত শক্ত না হলে ভবিষ্যৎ দুর্বল
শিশুর শারীরিক স্বাস্থ্যই তার জীবনের ভিত্তি। ছোটবেলায় যে অভ্যাস তৈরি হয়, তার প্রভাব পড়ে সারা জীবনে।
সঠিক পুষ্টির গুরুত্ব
ভারতীয় অনেক পরিবারেই এখনও অপুষ্টি বা ভুল পুষ্টির সমস্যা দেখা যায়। কেউ কম খায়, কেউ আবার শুধু ভাত আর আলুতেই বড় হয়।
শিশুর প্রতিদিনের খাবারে থাকা দরকার
শাকসবজি
ডাল
দুধ বা দুধজাত খাবার
ডিম বা মাছ
ফল
শুধু পেট ভরানো খাবার নয়, শরীর গঠনের খাবার দরকার। গ্রামে অনেক সময় দেখা যায়, শিশু শুধু ভাত আর নুন মাখা খেয়েই বড় হচ্ছে। আবার শহরে ফাস্ট ফুডের দাপট।
দুটোই শিশুর স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।
নিয়মিত ওজন ও উচ্চতা পর্যবেক্ষণ
শিশুর ওজন ও উচ্চতা বয়স অনুযায়ী ঠিক আছে কি না, তা নিয়মিত দেখা জরুরি। সরকারি অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্র বা স্কুলে এই মাপ নেওয়া হয়, কিন্তু অনেক বাবা মা গুরুত্ব দেন না।
অস্বাভাবিক ওজন কমা বা বেশি হওয়া দুটোই সমস্যার লক্ষণ হতে পারে।
টিকাকরণে অবহেলা নয়
ভারতে এখনও এমন পরিবার আছে যারা টিকা নিয়ে ভয় পান বা গুজবে বিশ্বাস করেন। কিন্তু টিকা শিশুকে মারাত্মক রোগ থেকে রক্ষা করে।
পোলিও, হাম, ডিপথেরিয়ার মতো রোগ একসময় বহু শিশুর জীবন কেড়ে নিয়েছে। টিকার জন্যই আজ সেগুলি নিয়ন্ত্রণে।
মানসিক স্বাস্থ্য: নীরব অথচ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ
শিশুর মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে এখনও সমাজে খুব কম কথা হয়। অনেকেই ভাবেন, বাচ্চাদের আবার স্ট্রেস কী।
বাস্তবে পড়াশোনার চাপ, তুলনা, শাসন, একাকিত্ব—সবকিছু শিশুর মনে গভীর প্রভাব ফেলে।
পড়াশোনার চাপ ও প্রত্যাশা
আজকের দিনে অনেক শিশুকেই খুব ছোট বয়স থেকেই অতিরিক্ত পড়াশোনার চাপ দেওয়া হয়। স্কুল, টিউশন, কোচিং—দিনের শেষে খেলাধুলার সময় থাকে না।
ফলে শিশু ধীরে ধীরে বিরক্ত, চুপচাপ বা রেগে যাওয়া স্বভাবের হয়ে ওঠে।
শিশু পড়াশোনা করবে, কিন্তু তার মানে এই নয় সে মানুষ হওয়া ভুলে যাবে।
তুলনা করার অভ্যাস
পাড়া প্রতিবেশীর ছেলে মেয়ের সঙ্গে তুলনা করা আমাদের সমাজে খুব সাধারণ বিষয়। কিন্তু এই তুলনা শিশুর আত্মবিশ্বাস ভেঙে দেয়।
একজন শিশু যদি বারবার শোনে সে কম পারছে, তাহলে সে নিজেকেই ছোট ভাবতে শুরু করে।
বাবা মায়ের সঙ্গে মানসিক যোগাযোগ
শিশু যদি নিজের কথা বাবা মাকে বলতে না পারে, তাহলে সেটাই বড় বিপদের ইঙ্গিত।
প্রতিদিন অন্তত কিছু সময় শিশুর সঙ্গে কথা বলা, তার দিনের গল্প শোনা মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য খুবই দরকার।
ঘুম: অবহেলিত কিন্তু অপরিহার্য
আজকাল অনেক শিশু গভীর রাত পর্যন্ত মোবাইল দেখে বা টিভি দেখে জেগে থাকে। সকালে ঘুম ঘুম চোখে স্কুলে যায়।
শিশুর বয়স অনুযায়ী পর্যাপ্ত ঘুম না হলে
মনোযোগ কমে
রাগ বাড়ে
শরীরের বৃদ্ধি ব্যাহত হয়
ঘুম কোনও বিলাসিতা নয়, এটি শিশুর স্বাস্থ্যের অংশ।
শারীরিক পরিশ্রম ও খেলাধুলা
একসময় শিশুরা বিকেলে মাঠে খেলত। এখন মাঠ নেই, সময় নেই।
খেলাধুলা শুধু শরীর নয়, মনকেও সুস্থ রাখে। দৌড়ঝাঁপ, লুকোচুরি, ক্রিকেট—এই সব খেলাই শিশুর স্বাভাবিক বিকাশে সাহায্য করে।
দিনে অন্তত কিছু সময় শরীরচর্চা না হলে শিশু ধীরে ধীরে অলস ও অসুস্থ হয়ে পড়ে।
চোখ ও দাঁতের যত্ন
অনেক বাবা মা ভাবেন, দুধের দাঁত পড়ে যাবে, তাই যত্নের দরকার নেই। কিন্তু ছোট বয়সের দাঁতের সমস্যা ভবিষ্যতে বড় সমস্যা ডেকে আনে।
একইভাবে অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম শিশুর চোখের ক্ষতি করছে। কম বয়সেই চশমার সংখ্যা বাড়ছে।
নিয়মিত চোখ ও দাঁতের পরীক্ষা এখন আর বিলাসিতা নয়।
পরিচ্ছন্নতা ও হাত ধোয়ার অভ্যাস
ছোট ছোট অভ্যাসই বড় রোগ থেকে বাঁচায়।
খাবারের আগে হাত ধোয়া
নখ ছোট রাখা
খোলা জায়গায় খাবার না খাওয়া
এই অভ্যাসগুলো শিশুকালেই শেখাতে হয়।
অসুখ হলে অবহেলা নয়
অনেক পরিবারেই দেখা যায়, জ্বর হলে বলা হয়, নিজে নিজেই সেরে যাবে। কখনও তা ঠিক, কিন্তু সব সময় নয়।
বারবার জ্বর, দীর্ঘদিন কাশি, ওজন না বাড়া—এই লক্ষণগুলো অবহেলা করলে ভবিষ্যতে বড় সমস্যা হতে পারে।
সামাজিক আচরণ ও নৈতিক শিক্ষা
শিশুর স্বাস্থ্য শুধু শরীর আর মন নয়, তার আচরণও গুরুত্বপূর্ণ।
ভদ্রভাবে কথা বলা
বড়দের সম্মান
সহানুভূতি
রাগ নিয়ন্ত্রণ
এই গুণগুলো শেখানোও এক ধরনের মানসিক স্বাস্থ্যচর্চা।
ডিজিটাল দুনিয়া ও শিশুর নিরাপত্তা
আজকের শিশু খুব অল্প বয়সেই মোবাইল ব্যবহার শেখে। এর ভাল দিক যেমন আছে, তেমনই ঝুঁকিও আছে।
অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম
অপ্রয়োজনীয় কনটেন্ট
অনলাইন আসক্তি
এই বিষয়গুলিতে বাবা মায়ের নজর না থাকলে সমস্যা বাড়ে।
গ্রাম ও শহরের চ্যালেঞ্জ আলাদা
গ্রামে সমস্যা অপুষ্টি ও চিকিৎসার অভাব
শহরে সমস্যা অতিরিক্ত চাপ ও অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন
কিন্তু লক্ষ্য একটাই, শিশুকে সুস্থ রাখা।
উপসংহার
শিশু স্বাস্থ্য কোনও একদিনের বিষয় নয়। এটি প্রতিদিনের ছোট ছোট সিদ্ধান্তের ফল।
আজ আপনি যদি সন্তানের খাবার, ঘুম, মন, খেলাধুলা আর অনুভূতির দিকে নজর দেন, তাহলে আগামী দিনে সে একজন সুস্থ মানুষ হয়ে উঠবে।
শিশুকে বড় করতে শুধু টাকা নয়, সময়, ধৈর্য আর ভালোবাসা লাগে। এই তিনটি থাকলেই শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষিত থাকে।
Know more: খালি পেটে লেবু জল ডিটক্স না ড্যামেজ? জানুন উপকারিতা ও ক্ষতির আসল সত্য
Know more: বাচ্চাদের মোবাইল আসক্তি কেন বাড়ছে? কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করবেন? জানুন চিকিৎসকের মতামত

হ্যালো! আমি Samapti, একজন ক্রিয়েটিভ কনটেন্ট নির্মাতা এবং ডিজিটাল স্টোরিটেলার। আমি আইডিয়াগুলোকে এমনভাবে উপস্থাপন করতে পছন্দ করি, যাতে কেবল তথ্যপূর্ণ নয়, পাঠকের জন্য আকর্ষণীয় এবং সহজে বোধ্যও হয়।
