বদ্ধ ঘরে মশা মারার কয়েল বা ধূপ ব্যবহার কতটা নিরাপদ? জানুন স্বাস্থ্যঝুঁকি ও সঠিক উপায়
গ্রীষ্ম হোক বা বর্ষা, ভারতের অধিকাংশ বাড়িতেই একটি সমস্যার নাম একটাই—মশা। শহরের ফ্ল্যাট থেকে গ্রামবাংলার কাঁচা বাড়ি, কোথাও এই সমস্যা এড়িয়ে যাওয়া যায় না। সন্ধে নামলেই অনেক ঘরে আগুন জ্বলে ওঠে মশা মারার কয়েলে বা ধূপে। অনেকের কাছে এটি দৈনন্দিন জীবনের অঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, বদ্ধ ঘরে এই ধরনের কয়েল বা ধূপ ব্যবহার করা কি সত্যিই নিরাপদ?
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের একাংশ বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে এই অভ্যাস শরীরের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। আবার অনেকের যুক্তি, মশার কামড়ে ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া বা চিকুনগুনিয়ার ঝুঁকি তার চেয়েও ভয়াবহ। এই দ্বন্দ্বের মাঝেই সাধারণ মানুষ সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগেন।
ভারতের বাড়িঘরে কয়েল ব্যবহারের অভ্যাস কীভাবে তৈরি হল
এক সময় গ্রামবাংলায় মশা তাড়াতে ব্যবহার করা হত ধোঁয়া দেওয়া শুকনো পাতা বা গোবর। পরে শহরে আসার সঙ্গে সঙ্গে বাজারে এল মশা মারার কয়েল। সস্তা, সহজলভ্য এবং ব্যবহার করাও সহজ—এই তিন কারণে কয়েল খুব দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
আজও নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের বড় অংশ রাতে কয়েল ছাড়া ঘুমোতে পারেন না। বিশেষ করে যেখানে এসি বা বৈদ্যুতিক মশা নিধন যন্ত্র ব্যবহার করার সামর্থ্য নেই, সেখানে কয়েলই ভরসা।
মশা মারার কয়েল বা ধূপে আসলে কী থাকে
বেশিরভাগ মশা মারার কয়েলে থাকে একটি রাসায়নিক উপাদান, যা পোকার স্নায়ুতন্ত্রে প্রভাব ফেলে। এই উপাদান ধোঁয়ার সঙ্গে বাতাসে মিশে যায়। মশার ক্ষেত্রে এটি কার্যকর হলেও, মানুষের শরীরেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কয়েলের ধোঁয়ায় এমন কিছু কণা থাকে যা দীর্ঘক্ষণ শ্বাসের সঙ্গে শরীরে প্রবেশ করলে ফুসফুসের ক্ষতি করতে পারে। বিশেষ করে শিশু, বৃদ্ধ এবং শ্বাসকষ্টে ভোগা মানুষদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি বেশি।
বদ্ধ ঘর কেন আলাদা ভাবে ঝুঁকিপূর্ণ
খোলা জায়গায় কয়েল জ্বালালে ধোঁয়া দ্রুত বেরিয়ে যায়। কিন্তু বদ্ধ ঘরে সেই সুযোগ নেই। জানালা-দরজা বন্ধ থাকলে ধোঁয়া ঘরের মধ্যেই জমে থাকে। ধীরে ধীরে সেই বাতাসই শ্বাসের সঙ্গে শরীরে ঢোকে।
অনেক বাড়িতেই দেখা যায়, রাতভর কয়েল জ্বলে থাকে। ঘুমের মধ্যে মানুষ বুঝতেও পারেন না, কতটা ধোঁয়া শরীরে ঢুকছে।
শিশু ও বয়স্কদের ক্ষেত্রে বিপদ কতটা
ভারতের বহু বাড়িতে ছোট শিশুদের শোওয়ানোর সময় কয়েল জ্বালানো হয়। অনেক অভিভাবকই মনে করেন, মশার কামড় থেকে বাঁচানোই সবচেয়ে জরুরি। কিন্তু শিশুদের ফুসফুস এখনও সম্পূর্ণভাবে গড়ে ওঠে না। ধোঁয়ার প্রভাব তাদের শরীরে দ্রুত পড়ে।
একই কথা প্রযোজ্য বয়স্কদের ক্ষেত্রেও। যাঁদের আগে থেকেই শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি বা হৃদরোগ রয়েছে, তাঁদের জন্য কয়েলের ধোঁয়া বাড়তি ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
গ্রাম ও শহরের অভিজ্ঞতা এক নয়
গ্রামাঞ্চলে অনেক সময় বাড়ির গঠন এমন হয় যে বাতাস চলাচলের সুযোগ বেশি থাকে। সেখানে কয়েলের ক্ষতিকর প্রভাব তুলনামূলক কম হতে পারে। কিন্তু শহরের ছোট ফ্ল্যাট বা এক কামরার ঘরে পরিস্থিতি আলাদা।
বিশেষ করে বস্তি বা ঘিঞ্জি এলাকায়, যেখানে জানালা কম, সেখানে ধোঁয়া বেরনোর পথ প্রায় থাকে না। এই পরিস্থিতিতে নিয়মিত কয়েল ব্যবহার স্বাস্থ্যের উপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।
মশার কামড়ের ঝুঁকি কি কম
অন্যদিকে বাস্তবতাও অস্বীকার করা যায় না। ভারতে ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া, চিকুনগুনিয়া এখন বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যা। প্রতি বছর বর্ষার পর হাসপাতালগুলোতে ভিড় বাড়ে।
অনেক চিকিৎসকই বলেন, মশার কামড় এড়ানো অত্যন্ত জরুরি। তাই পুরোপুরি কয়েল বন্ধ করে দেওয়া সব পরিবারের পক্ষে সম্ভব নয়।
ধূপ কি কয়েলের থেকে নিরাপদ
অনেকে মনে করেন, ধূপ যেহেতু ধর্মীয় কাজে ব্যবহৃত হয়, তাই তা নিরাপদ। কিন্তু ধূপ থেকেও ধোঁয়া তৈরি হয়। সেই ধোঁয়ায়ও ক্ষতিকর কণা থাকতে পারে।
বিশেষ করে যদি ধূপটি রাসায়নিক মিশ্রণে তৈরি হয়, তাহলে তার প্রভাব কয়েলের মতোই হতে পারে। প্রাকৃতিক উপাদানে তৈরি ধূপ তুলনামূলক কম ক্ষতিকর হলেও, বদ্ধ ঘরে দীর্ঘক্ষণ ব্যবহার তাও সমস্যার কারণ হতে পারে।
বাজারে পাওয়া প্রাকৃতিক বিকল্প কতটা কার্যকর
বর্তমানে বাজারে নিম, লেমনগ্রাস বা অন্যান্য প্রাকৃতিক উপাদানে তৈরি মশা তাড়ানোর পণ্য পাওয়া যায়। অনেকেই সেগুলিকে নিরাপদ বিকল্প হিসেবে দেখছেন।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রাকৃতিক হলেও ধোঁয়া মানেই শ্বাসনালীর উপর চাপ। তাই ব্যবহার সীমিত রাখা জরুরি।
দৈনন্দিন জীবনে বিকল্প উপায় কী হতে পারে
মশা তাড়ানোর জন্য শুধুই কয়েলের উপর নির্ভর না করে কিছু অভ্যাস বদলানো যেতে পারে।
বাড়ির আশেপাশে জল জমতে না দেওয়া
মশারি ব্যবহার করা
জানালায় জাল লাগানো
সন্ধ্যার পর দরজা-জানালা বন্ধ রাখা
ঘরের ভেতর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা
এই সব পদ্ধতি একসঙ্গে মেনে চললে কয়েলের প্রয়োজন অনেকটাই কমে যেতে পারে।
রাতভর কয়েল জ্বালানো কতটা ঠিক
অনেকেই সন্ধ্যায় কয়েল জ্বালিয়ে সকাল পর্যন্ত রেখে দেন। চিকিৎসকদের মতে, এটি সবচেয়ে ক্ষতিকর অভ্যাসগুলোর একটি। প্রয়োজন হলে কয়েল কিছু সময় ব্যবহার করে বন্ধ করা উচিত।
বিশেষ করে ঘুমানোর সময়, যখন শ্বাসপ্রশ্বাস ধীর হয়, তখন ধোঁয়ার প্রভাব আরও গভীর হতে পারে।
প্রশাসনের ভূমিকা ও জনসচেতনতা
মশা নিয়ন্ত্রণ শুধু ব্যক্তিগত সমস্যা নয়, এটি সামাজিক দায়িত্বও। অনেক এলাকায় নিয়মিত নিকাশি ব্যবস্থা ঠিক না থাকার কারণে মশার বংশবিস্তার বেড়ে যায়।
স্থানীয় প্রশাসনের পাশাপাশি সাধারণ মানুষকেও সচেতন হতে হবে। শুধু কয়েল জ্বালিয়ে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।
চিকিৎসকদের পরামর্শ কী বলছে
বেশিরভাগ চিকিৎসকই একমত যে, বদ্ধ ঘরে নিয়মিত কয়েল বা ধূপ ব্যবহার এড়ানো উচিত। খুব প্রয়োজন হলে জানালা খুলে ব্যবহার করা যেতে পারে, যাতে ধোঁয়া বেরিয়ে যায়।
শিশু ও অসুস্থ ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা জরুরি।
সামাজিক অভ্যাস বদলানো কতটা সম্ভব
ভারতের মতো দেশে অভ্যাস বদলানো সহজ নয়। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা কয়েল ব্যবহারের অভ্যাস হঠাৎ বন্ধ করা কঠিন।
তবে ধীরে ধীরে সচেতনতা বাড়লে মানুষ বিকল্প পথ খুঁজতে আগ্রহী হতে পারেন। ইতিমধ্যেই অনেক পরিবার মশারি বা অন্যান্য পদ্ধতির দিকে ঝুঁকছেন।
শেষ কথা
বদ্ধ ঘরে মশা মারার কয়েল বা ধূপ ব্যবহার করা উচিত কি না, তার উত্তর সাদা-কালো নয়। একদিকে মশাবাহিত রোগের ভয়, অন্যদিকে ধোঁয়ার ক্ষতিকর প্রভাব—এই দুইয়ের মাঝে ভারসাম্য খুঁজে নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।
অযথা দীর্ঘক্ষণ কয়েল জ্বালানো, বিশেষ করে বদ্ধ ঘরে, স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। প্রয়োজন অনুযায়ী সীমিত ব্যবহার, সঙ্গে বিকল্প পদ্ধতি—এই পথই আপাতত সবচেয়ে নিরাপদ।
স্বাস্থ্য সুরক্ষা আর দৈনন্দিন বাস্তবতার মাঝে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়াই আজকের সময়ে সবচেয়ে জরুরি।
Know more: ক্যানসার প্রতিরোধে সহায়ক ৩টি সব্জি: কীভাবে প্রতিদিনের ডায়েটে রাখবেন জেনে নিন
Know more: বাচ্চাদের মোবাইল আসক্তি কেন বাড়ছে? কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করবেন? জানুন চিকিৎসকের মতামত

হ্যালো! আমি Samapti, একজন ক্রিয়েটিভ কনটেন্ট নির্মাতা এবং ডিজিটাল স্টোরিটেলার। আমি আইডিয়াগুলোকে এমনভাবে উপস্থাপন করতে পছন্দ করি, যাতে কেবল তথ্যপূর্ণ নয়, পাঠকের জন্য আকর্ষণীয় এবং সহজে বোধ্যও হয়।

One Comment