non stick cooking health

নন স্টিকে রান্না করলে কি বিপদ হতে পারে: স্বাস্থ্যের উপর প্রভাব ও ভারতীয় রান্নাঘরের বাস্তব সত্য

আজকের দিনে ভারতীয় রান্নাঘরে নন স্টিক বাসন প্রায় অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। শহরের ফ্ল্যাট হোক বা ছোট শহরের বাড়ি, সকালের ডিম ভাজা থেকে রাতের মাছের ঝোল—সবেতেই নন স্টিক কড়াই বা প্যানের ব্যবহার চোখে পড়ে। কম তেলে রান্না হয়, খাবার লেগে যায় না, ধোয়া সহজ—এই সুবিধাগুলির জন্যই নন স্টিক এত জনপ্রিয়।

কিন্তু এই সুবিধার আড়ালে কি কোনও বিপদ লুকিয়ে আছে। সাম্প্রতিক সময়ে অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, নন স্টিকে রান্না করলে স্বাস্থ্যের ক্ষতি হয় কি না। এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে বিজ্ঞাপন নয়, বাস্তব অভিজ্ঞতা আর বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি একসঙ্গে বোঝা জরুরি।

নন স্টিক বাসন কীভাবে কাজ করে

নন স্টিক বাসনের মূল বৈশিষ্ট্য হল এর ওপরের আবরণ। এই আবরণ খাবারকে পাত্রের সঙ্গে লেগে থাকতে দেয় না। ফলে কম তেলে রান্না সম্ভব হয়।

এই আবরণটি সাধারণত এক ধরনের রাসায়নিক প্রলেপ দিয়ে তৈরি, যা উচ্চ তাপমাত্রায় খাবারকে আটকে রাখে না। সমস্যার শুরু হয় ঠিক এখান থেকেই।

ভারতীয় রান্নার সঙ্গে নন স্টিকের সংঘাত

ভারতীয় রান্না মানেই বেশিরভাগ সময় বেশি আঁচ। সরষের তেল গরম করা, কড়াইতে মশলা কষানো, ডাল ফোড়ন দেওয়া—সব ক্ষেত্রেই তাপমাত্রা অনেক বেশি হয়।

নন স্টিক বাসন মূলত কম থেকে মাঝারি আঁচের জন্য তৈরি। কিন্তু আমাদের অভ্যাস অনুযায়ী অনেকেই নন স্টিক কড়াইয়েও চড়া আঁচে রান্না করেন। এতে নন স্টিকের প্রলেপ ধীরে ধীরে নষ্ট হতে শুরু করে।

উচ্চ তাপে কী ধরনের বিপদ হতে পারে

নন স্টিক প্যান যদি খুব বেশি গরম করা হয়, তাহলে তার ওপরের আবরণ থেকে ক্ষতিকর ধোঁয়া বেরোতে পারে। এই ধোঁয়া চোখে দেখা যায় না, কিন্তু শ্বাসের সঙ্গে শরীরে ঢুকতে পারে।

অনেক গৃহিণী বলেন, খালি নন স্টিক কড়াই চুলায় বসিয়ে রেখে কাজ করতে গেলে পরে অদ্ভুত গন্ধ পাওয়া যায়। এই গন্ধ আসলে প্রলেপের ক্ষয়ের ইঙ্গিত।

দীর্ঘদিন এই ধোঁয়ার সংস্পর্শে থাকলে শ্বাসকষ্ট, মাথা ঘোরা, বুক ধড়ফড়ের মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।

প্রলেপ খসে গেলে কী হয়

নন স্টিক প্যান পুরনো হলে বা ঠিকমতো ব্যবহার না করলে প্রলেপ খসে পড়তে শুরু করে। অনেক সময় রান্নার খাবারের সঙ্গেই সেই ক্ষুদ্র কণা শরীরে ঢুকে যায়।

এটি সঙ্গে সঙ্গে কোনও বড় অসুখ তৈরি না করলেও, দীর্ঘদিনের ব্যবহারে শরীরে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেন।

বিশেষ করে যাঁরা প্রতিদিন নন স্টিক ব্যবহার করেন, তাঁদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি।

কাঠ বা ধাতব খুন্তি ব্যবহারের সমস্যা

ভারতীয় রান্নাঘরে লোহার খুন্তি বা খুন্তা ব্যবহার খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু নন স্টিক পাত্রে ধাতব খুন্তি ব্যবহার করলে প্রলেপ দ্রুত উঠে যায়।

অনেকেই ভাবেন, একটু আঁচড় পড়লে কিছু হয় না। কিন্তু সেই ছোট আঁচড় থেকেই শুরু হয় বড় ক্ষতি। সেখান দিয়ে প্রলেপ খসে খাবারের সঙ্গে মিশে যেতে পারে।

কম তেলের সুবিধা কি আসলেই নিরাপদ

নন স্টিকের সবচেয়ে বড় প্রচার হল কম তেলে রান্না। এতে ক্যালোরি কম হয়, ওজন নিয়ন্ত্রণে থাকে—এই যুক্তি শুনিয়ে নন স্টিক জনপ্রিয় হয়েছে।

কিন্তু কম তেলের সুবিধার সঙ্গে যদি শরীরে ক্ষতিকর রাসায়নিক ঢুকে পড়ে, তাহলে সেই লাভ কতটা টেকসই, সেই প্রশ্ন তুলছেন অনেক পুষ্টিবিদ।

স্বাস্থ্য মানে শুধু ওজন কমানো নয়, ভিতরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সুরক্ষিত রাখাও জরুরি।

গ্রাম বনাম শহরের অভিজ্ঞতা

গ্রামবাংলায় এখনও বেশিরভাগ বাড়িতে লোহার কড়াই বা মাটির হাঁড়ির ব্যবহার দেখা যায়। সেখানে নন স্টিকের ব্যবহার তুলনামূলক কম।

শহরের ফ্ল্যাটে জায়গার অভাব, সময়ের অভাব—সব মিলিয়ে নন স্টিক সহজ সমাধান হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু শহরেই সবচেয়ে বেশি শ্বাসকষ্ট, অ্যালার্জি, হরমোনজনিত সমস্যার কথাও শোনা যায়।

সব সমস্যার জন্য নন স্টিক দায়ী না হলেও, এর ভূমিকা পুরোপুরি অস্বীকার করা যায় না।

শিশু ও বৃদ্ধদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি বেশি কেন

শিশু ও বৃদ্ধদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তুলনামূলক কম। ফলে নন স্টিকের ক্ষতিকর প্রভাব তাঁদের শরীরে দ্রুত দেখা দিতে পারে।

অনেক মা নন স্টিক প্যানে বাচ্চাদের জন্য প্যানকেক বা ডিম তৈরি করেন। কিন্তু যদি প্যান পুরনো হয় বা আঁচ বেশি থাকে, তাহলে ঝুঁকি থেকেই যায়।

নন স্টিক ব্যবহারে যে ভুলগুলো আমরা করি

অনেকেই নন স্টিক ব্যবহারের নিয়ম জানেন না বা মানেন না।

খালি প্যান চুলায় বসানো
খুব বেশি আঁচে রান্না করা
ধাতব খুন্তি ব্যবহার
ডিশওয়াশার বা শক্ত স্ক্রাব দিয়ে ঘষা
প্রলেপ উঠে গেলেও ব্যবহার চালিয়ে যাওয়া

এই ভুলগুলোই নন স্টিককে বিপজ্জনক করে তোলে।

বিকল্প কী হতে পারে

অনেকেই এখন আবার লোহার কড়াই, স্টিলের পাত্র বা মাটির হাঁড়ির দিকে ফিরছেন। এগুলিতে একটু বেশি যত্ন লাগে, তেলও হয়তো একটু বেশি লাগে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এগুলো তুলনামূলক নিরাপদ।

বিশেষ করে ভাজা বা বেশি আঁচের রান্নার জন্য লোহার কড়াই অনেক বেশি উপযোগী।

নন স্টিক কি একেবারেই ব্যবহার করা উচিত নয়

এখানে পরিষ্কার করে বলা দরকার, নন স্টিক একেবারে নিষিদ্ধ এমন নয়। সঠিক নিয়মে, কম আঁচে, নতুন প্যান ব্যবহার করলে ঝুঁকি অনেকটাই কমানো যায়।

সমস্যা হয় তখনই, যখন আমরা সুবিধার জন্য নিয়ম ভাঙি।

সচেতনতা কেন সবচেয়ে জরুরি

আজ বাজারে যেভাবে নন স্টিক পণ্যের প্রচার হচ্ছে, তাতে ঝুঁকির কথা খুব কমই বলা হয়। সচেতন না হলে মানুষ অজান্তেই নিজের স্বাস্থ্যের ক্ষতি করে ফেলতে পারেন।

রান্নাঘর মানে শুধু স্বাদের জায়গা নয়, স্বাস্থ্যের প্রথম ধাপ।

উপসংহার

নন স্টিক বাসন আধুনিক জীবনের সুবিধা এনে দিয়েছে, এতে কোনও সন্দেহ নেই। কিন্তু সেই সুবিধার সঙ্গে কিছু ঝুঁকিও জড়িয়ে আছে।

চোখ বন্ধ করে ব্যবহার না করে, নিয়ম মেনে, সীমিত ব্যবহারই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ। প্রয়োজনে বিকল্পের কথা ভাবাও জরুরি।

কারণ রান্নার উদ্দেশ্য শুধু পেট ভরানো নয়, পরিবারকে সুস্থ রাখা। সেই সুস্থতার জন্যই আজ নন স্টিক নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।

Know more: বদ্ধ ঘরে মশা মারার কয়েল বা ধূপ ব্যবহার কতটা নিরাপদ? জানুন স্বাস্থ্যঝুঁকি ও সঠিক উপায়

Know more: খালি পেটে লেবু জল ডিটক্স না ড্যামেজ? জানুন উপকারিতা ও ক্ষতির আসল সত্য

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *