নিপা ভাইরাস কী? কীভাবে ছড়ায়, উপসর্গ কী ও প্রতিরোধের উপায় জানুন বিস্তারিতভাবে

প্রতিবার বর্ষা এলেই ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে কিছু রোগ নিয়ে নতুন করে আতঙ্ক ছড়ায়। কখনও ডেঙ্গু, কখনও চিকুনগুনিয়া, আবার কখনও এমন একটি নাম উঠে আসে, যা শুনলেই মানুষের মনে ভয় তৈরি হয়। সেই নাম নিপা ভাইরাস। কেরালা থেকে শুরু করে দেশের অন্যান্য রাজ্যেও মাঝেমধ্যেই নিপা ভাইরাস সংক্রমণের খবর সামনে আসে। আক্রান্তের সংখ্যা কম হলেও মৃত্যুহার বেশি হওয়ায় এই রোগ নিয়ে উদ্বেগ স্বাভাবিক।

তাহলে নিপা ভাইরাস আসলে কী, কীভাবে এই রোগ ছড়ায়, এর উপসর্গই বা কী, আর সাধারণ মানুষ হিসেবে কীভাবে নিজেকে ও পরিবারকে সুরক্ষিত রাখা যায়, সেই সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই এই বিস্তারিত প্রতিবেদন।

নিপা ভাইরাস আসলে কী

নিপা ভাইরাস একটি প্রাণী থেকে মানুষের মধ্যে ছড়ানো সংক্রামক ভাইরাস। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় জুনোটিক ভাইরাস। অর্থাৎ এই ভাইরাস মূলত পশুপাখির শরীরে বাস করে এবং নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে মানুষের শরীরে সংক্রমণ ঘটায়।

এই ভাইরাস প্রথম শনাক্ত হয় নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে। তখন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একাধিক দেশে হঠাৎ করে অজানা জ্বর ও স্নায়বিক সমস্যায় বহু মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে জানা যায়, এর জন্য দায়ী একটি নতুন ভাইরাস, যার নাম দেওয়া হয় নিপা।

ভারতে নিপা ভাইরাসের ইতিহাস

ভারতে নিপা ভাইরাস প্রথম বড় আকারে আলোচনায় আসে কেরালায়। কেরালার কিছু জেলায় একাধিকবার নিপা সংক্রমণের ঘটনা সামনে এসেছে। আক্রান্তের সংখ্যা তুলনামূলক কম হলেও অনেক ক্ষেত্রে রোগীর মৃত্যু হয়েছে, যা স্বাভাবিকভাবেই আতঙ্ক বাড়িয়েছে।

কেরালার অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে অন্যান্য রাজ্যেও এখন নিপা নিয়ে সতর্কতা জারি করা হয়। বিশেষ করে বর্ষাকালে এবং ফলের মরসুমে এই সতর্কতা আরও বাড়ানো হয়।

নিপা ভাইরাসের মূল বাহক কারা

নিপা ভাইরাসের প্রধান বাহক হল ফলখেকো বাদুড়। এই বাদুড় সাধারণত গাছে ঝুলে থাকা ফল খায় এবং সেই ফলের উপর লালা বা মল ত্যাগ করে। সেই ফল যদি কোনও মানুষ বা পশু খায়, তখন সংক্রমণের ঝুঁকি তৈরি হয়।

ভারতের গ্রামাঞ্চলে বা শহরতলিতে অনেক সময় খেজুরের রস, আম, কলা, পেঁপে ইত্যাদি খোলা জায়গায় রাখা হয়। বাদুড় যদি সেই ফল বা রসের সংস্পর্শে আসে, সেখান থেকেই ভাইরাস ছড়ানোর সম্ভাবনা থাকে।

কীভাবে মানুষের মধ্যে নিপা ভাইরাস ছড়ায়

নিপা ভাইরাস ছড়ানোর একাধিক পথ রয়েছে।

প্রথমত, বাদুড়ের দ্বারা দূষিত ফল বা খাবার খাওয়ার মাধ্যমে সংক্রমণ হতে পারে। গ্রামবাংলায় অনেক সময় গাছ থেকে পড়ে থাকা ফল কুড়িয়ে খাওয়ার চল রয়েছে। এই অভ্যাস ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।

দ্বিতীয়ত, আক্রান্ত পশুর সংস্পর্শে এলে সংক্রমণ হতে পারে। বিশেষ করে শূকর বা অন্যান্য গৃহপালিত পশু এই ভাইরাস বহন করতে পারে।

তৃতীয়ত, সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হল মানুষ থেকে মানুষের মধ্যে সংক্রমণ। আক্রান্ত ব্যক্তির খুব কাছাকাছি থাকলে, তাঁর শরীরের তরল পদার্থের সংস্পর্শে এলে বা দীর্ঘ সময় একই জায়গায় থাকলে ভাইরাস ছড়াতে পারে। হাসপাতাল বা বাড়িতে পরিচর্যার সময় এই ঝুঁকি বেশি থাকে।

নিপা ভাইরাসের উপসর্গ কী কী

নিপা ভাইরাসের উপসর্গ প্রথম দিকে অনেকটাই সাধারণ জ্বরের মতো। এখানেই সমস্যা তৈরি হয়, কারণ শুরুতে রোগটিকে আলাদা করে চেনা কঠিন হয়ে পড়ে।

প্রাথমিক উপসর্গের মধ্যে রয়েছে জ্বর, মাথাব্যথা, শরীর ব্যথা, দুর্বলতা এবং বমি বমি ভাব। অনেক রোগীর ক্ষেত্রে সর্দি বা কাশির মতো উপসর্গও দেখা দিতে পারে।

কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যেই পরিস্থিতি গুরুতর হয়ে উঠতে পারে। মাথা ঘোরা, অচেতন হয়ে যাওয়া, বিভ্রান্তি, কথা জড়িয়ে যাওয়া বা খিঁচুনি শুরু হতে পারে। এর মানে ভাইরাস মস্তিষ্কে প্রভাব ফেলছে।

কিছু ক্ষেত্রে শ্বাসকষ্ট দেখা যায়, যা রোগীর অবস্থাকে আরও জটিল করে তোলে।

কেন নিপা ভাইরাসকে এত ভয়ংকর বলা হয়

নিপা ভাইরাসের সবচেয়ে বড় ভয় হল এর মৃত্যুহার তুলনামূলকভাবে বেশি। সব রোগীর ক্ষেত্রে নয়, কিন্তু যাঁদের ক্ষেত্রে রোগ গুরুতর আকার নেয়, তাঁদের বাঁচানো কঠিন হয়ে পড়ে।

আরেকটি বড় সমস্যা হল, এই রোগের জন্য এখনও কোনও নির্দিষ্ট প্রতিষেধক বা টিকা সাধারণ মানুষের জন্য সহজলভ্য নয়। চিকিৎসা মূলত উপসর্গ অনুযায়ী করা হয়।

এছাড়া রোগ দ্রুত ছড়াতে পারে এবং শুরুতে উপসর্গ সাধারণ হওয়ায় অনেক সময় দেরিতে শনাক্ত হয়।

নিপা ভাইরাস কি বাতাসে ছড়ায়

এই প্রশ্নটি বহু মানুষের মনে আসে। নিপা ভাইরাস সাধারণভাবে বাতাসে ছড়ায় না। কিন্তু আক্রান্ত ব্যক্তির খুব কাছাকাছি থাকলে, তাঁর কাশি, হাঁচি বা শরীরের তরলের সংস্পর্শে এলে সংক্রমণের আশঙ্কা থাকে।

তাই হাসপাতালে বা বাড়িতে আক্রান্ত ব্যক্তির পরিচর্যার সময় অতিরিক্ত সতর্কতা প্রয়োজন।

কোন কোন এলাকায় ঝুঁকি বেশি

যেসব এলাকায় ফলখেকো বাদুড়ের সংখ্যা বেশি, বা যেখানে খোলা ফল ও খেজুরের রস ব্যবহারের চল রয়েছে, সেখানে ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি।

কেরালা ছাড়াও ভারতের অন্য রাজ্যগুলিতেও বাদুড় রয়েছে। তাই নিপা কোনও একটি রাজ্যের সমস্যা নয়। বরং সচেতনতা না থাকলে যে কোনও জায়গাতেই ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

সাধারণ মানুষের কী কী সতর্কতা নেওয়া উচিত

নিপা ভাইরাস থেকে বাঁচার সবচেয়ে বড় উপায় হল সতর্কতা।

খোলা বা আধখাওয়া ফল কখনও খাওয়া উচিত নয়। ফল ভালো করে ধুয়ে, প্রয়োজন হলে খোসা ছড়িয়ে তবেই খাওয়া উচিত।

খেজুরের রস বা অন্য কোনও খোলা রস পান করার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হবে। বিশেষ করে যদি সেই রস দীর্ঘ সময় খোলা জায়গায় থাকে।

বাদুড় বা অসুস্থ পশুর সংস্পর্শ এড়িয়ে চলা অত্যন্ত জরুরি। মৃত বা অসুস্থ পশু দেখলে স্থানীয় প্রশাসনকে জানানো উচিত।

জ্বর হলে কখন সন্দেহ করবেন

সব জ্বর মানেই নিপা নয়। কিন্তু যদি জ্বরের সঙ্গে মাথাব্যথা, বমি, বিভ্রান্তি বা খিঁচুনির মতো উপসর্গ দেখা যায় এবং সম্প্রতি কোনও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় যাতায়াত থাকে, তাহলে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যাওয়া জরুরি।

নিজে নিজে ওষুধ খেয়ে বিষয়টি হালকা ভাবে নেওয়া বিপজ্জনক হতে পারে।

নিপা ভাইরাসের চিকিৎসা কীভাবে হয়

নিপা ভাইরাসের নির্দিষ্ট কোনও ওষুধ এখনও নেই। চিকিৎসা মূলত রোগীর উপসর্গ অনুযায়ী করা হয়। জ্বর, শ্বাসকষ্ট বা স্নায়বিক সমস্যার চিকিৎসা আলাদা ভাবে করা হয়।

গুরুতর ক্ষেত্রে রোগীকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে রাখা হয়। দ্রুত চিকিৎসা শুরু হলে অনেক ক্ষেত্রে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব হয়।

সরকার ও স্বাস্থ্য দফতরের ভূমিকা

নিপা সংক্রমণের খবর পাওয়া মাত্রই রাজ্য ও কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য দফতর সক্রিয় হয়ে ওঠে। আক্রান্ত এলাকা চিহ্নিত করা হয়, সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের নজরে রাখা হয় এবং প্রয়োজন হলে আলাদা করে রাখা হয়।

কেরালার অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, দ্রুত ব্যবস্থা নিলে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।

আতঙ্ক নয়, সচেতনতা জরুরি

নিপা ভাইরাসের নাম শুনলেই আতঙ্কিত হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু ভয় পেয়ে ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়া বিপজ্জনক। গুজব ছড়ালে সমস্যা আরও বাড়ে।

সঠিক তথ্য জানা, স্বাস্থ্য দফতরের নির্দেশ মেনে চলা এবং প্রয়োজন ছাড়া আতঙ্ক না ছড়ানোই সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।

পরিবারের ক্ষেত্রে কীভাবে সাবধান থাকবেন

বাড়িতে বয়স্ক মানুষ বা শিশু থাকলে বাড়তি সতর্কতা দরকার। বাইরের ফল বা খাবার ভালো করে পরিষ্কার করা, অসুস্থ কাউকে আলাদা রাখা এবং হাত ধোয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা খুব গুরুত্বপূর্ণ।

গ্রামাঞ্চলে বা শহরতলিতে বসবাসকারী পরিবারগুলির ক্ষেত্রে এই সচেতনতা আরও বেশি প্রয়োজন।

শেষ কথা

নিপা ভাইরাস একটি গুরুতর রোগ, কিন্তু এটি অজেয় নয়। সচেতনতা, সময়মতো চিকিৎসা এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চললে এই রোগের ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।

ভয় নয়, তথ্যই আমাদের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। নিজে সচেতন থাকুন, অন্যকেও সচেতন করুন। তাতেই বিপদ অনেকটা দূরে রাখা সম্ভব।

Know more: ক্যানসার প্রতিরোধে সহায়ক ৩টি সব্জি: কীভাবে প্রতিদিনের ডায়েটে রাখবেন জেনে নিন

Know more: Winter Skin Care: শীতে ত্বকের যত্ন কীভাবে নেবেন বড়দিনের আগে উজ্জ্বল ত্বক পেতে সম্পূর্ণ গাইড

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *