Bengal SIR Row ভবানীপুরে বাদ পড়তে পারে ৪৪ হাজার ৭৮৫ জন ভোটারের নাম, ৫৮ লক্ষের বেশি ভোটারের নাম বাদ পড়ার আশঙ্কা
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে আবারও কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে ভোটার তালিকা। SIR বা স্পেশাল ইন্টেনসিভ রিভিশন প্রক্রিয়াকে ঘিরে তৈরি হয়েছে তীব্র বিতর্ক, উদ্বেগ এবং রাজনৈতিক চাপানউতোর। সাম্প্রতিক আলোচনায় সবচেয়ে বেশি নজর কাড়ছে ভবানীপুর বিধানসভা কেন্দ্র, যেখানে দাবি করা হচ্ছে প্রায় ৪৪ হাজার ৭৮৫ জন ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়তে পারে। শুধু ভবানীপুর নয়, গোটা রাজ্যজুড়ে এই সংখ্যা ৫৮ লক্ষের বেশি হতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, কেন এই ভোটার তালিকা সংশোধন, কীভাবে হচ্ছে এই প্রক্রিয়া, এতে কারা প্রভাবিত হতে পারেন এবং সাধারণ ভোটারের করণীয় কী। এই প্রতিবেদনে বিশদে তুলে ধরা হল Bengal SIR Row নিয়ে তৈরি হওয়া পুরো বিতর্কের প্রেক্ষাপট, প্রশাসনিক ব্যাখ্যা এবং সাধারণ মানুষের আশঙ্কা।
SIR বা স্পেশাল ইন্টেনসিভ রিভিশন কী
ভোটার তালিকা নিয়মিত হালনাগাদ করা নির্বাচন কমিশনের একটি স্বীকৃত প্রক্রিয়া। নির্দিষ্ট সময় অন্তর এই তালিকা সংশোধনের মাধ্যমে মৃত ভোটারদের নাম বাদ দেওয়া, নতুন ভোটার যুক্ত করা এবং ঠিকানা সংশোধনের কাজ করা হয়।
SIR বা স্পেশাল ইন্টেনসিভ রিভিশন সাধারণ সংশোধনের তুলনায় অনেক বেশি বিস্তৃত ও কঠোর একটি প্রক্রিয়া। এখানে প্রতিটি ভোটারের তথ্য নতুন করে যাচাই করা হয় বলে দাবি করা হয়। ভোটারের বয়স, ঠিকানা, নাগরিকত্ব সংক্রান্ত তথ্য এবং নথির সঙ্গে তালিকার মিল খতিয়ে দেখা হয়।
সমস্যা শুরু হয় তখনই, যখন এই যাচাই প্রক্রিয়ায় বহু মানুষের নাম বাদ পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
ভবানীপুর কেন আলোচনার কেন্দ্রে
ভবানীপুর বিধানসভা কেন্দ্র পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক মানচিত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি শুধু কলকাতার একটি কেন্দ্র নয়, বরং রাজ্যের রাজনৈতিক ইতিহাসের সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত।
এই কেন্দ্রেই প্রায় ৪৪ হাজার ৭৮৫ জন ভোটারের নাম বাদ পড়তে পারে বলে যে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে, তা স্বাভাবিকভাবেই রাজনৈতিক মহলে শোরগোল ফেলে দিয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে দাবি, ভোটার তালিকার খসড়া যাচাইয়ের সময় বহু পুরনো ভোটারের নাম অনুপস্থিত পাওয়া যাচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছেন বহু প্রবীণ নাগরিক, ভাড়াবাড়িতে থাকা পরিবার এবং পরিযায়ী শ্রমিকদের পরিবার।
রাজ্যজুড়ে ৫৮ লক্ষ ভোটার বাদ পড়ার আশঙ্কা কতটা বাস্তব
শুধু ভবানীপুর নয়, গোটা রাজ্য জুড়ে ৫৮ লক্ষের বেশি ভোটারের নাম বাদ পড়তে পারে বলে যে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে, তা নিয়ে প্রশাসন ও রাজনৈতিক দলগুলির বক্তব্য আলাদা আলাদা।
একাংশের মতে, এই সংখ্যা প্রাথমিক হিসাব বা আশঙ্কামাত্র। অন্যদিকে বিরোধীদের দাবি, এই বিপুল সংখ্যক ভোটার বাদ পড়লে তা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার উপর বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
পশ্চিমবঙ্গের মতো রাজ্যে, যেখানে বহু মানুষ কাজের সূত্রে ঠিকানা বদলান, ভাড়াবাড়িতে থাকেন বা দীর্ঘদিন গ্রামে ও শহরের মধ্যে যাতায়াত করেন, সেখানে এই ধরনের তালিকা সংশোধন স্বাভাবিকভাবেই জটিল।
ভোটারদের নাম কেন বাদ পড়তে পারে
নির্বাচন কমিশনের প্রক্রিয়া অনুযায়ী কয়েকটি কারণে ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়তে পারে।
এক, ভোটারের মৃত্যু হলে
দুই, একই ব্যক্তির একাধিক জায়গায় নাম থাকলে
তিন, দীর্ঘদিন ধরে ভোট না দিলে এবং ঠিকানা যাচাইয়ে সমস্যা হলে
চার, প্রয়োজনীয় নথি আপডেট না থাকলে
কিন্তু বাস্তবে অনেক সময় দেখা যায়, এই যাচাই প্রক্রিয়ায় ভুল বা তথ্যগত গরমিলের কারণে জীবিত ও নিয়মিত ভোট দেওয়া নাগরিকদের নামও বাদ পড়ে যেতে পারে।
শহুরে ভোটারদের ক্ষেত্রে সমস্যা কেন বেশি
কলকাতা ও তার আশপাশের শহরাঞ্চলে ভোটার তালিকা সংশোধন বরাবরই একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
ভাড়াবাড়িতে থাকা মানুষ বারবার ঠিকানা বদলান। অনেক সময় ভোটার কার্ডে পুরনো ঠিকানা থেকে যায়। আবার বাড়ির মালিক বদল হলে বা ফ্ল্যাট নম্বর বিভ্রান্তিতে ভোটার যাচাইয়ে সমস্যা হয়।
ভবানীপুরের মতো এলাকায় এই সমস্যাগুলি আরও প্রকট বলে মনে করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
পরিযায়ী শ্রমিক ও মধ্যবিত্ত পরিবার সবচেয়ে বেশি বিপদে
রাজ্যের বহু মানুষ কাজের সূত্রে ভিন রাজ্যে থাকেন। তাঁদের পরিবার এখানে থাকলেও ভোটার যাচাইয়ের সময় বাড়িতে না পাওয়া গেলে নাম বাদ পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
এছাড়া মধ্যবিত্ত বহু পরিবার যাঁরা চাকরি বা সন্তানের পড়াশোনার কারণে সাময়িকভাবে অন্যত্র থাকেন, তাঁদের ক্ষেত্রেও এই সমস্যা দেখা দিতে পারে।
এই বিষয়টি নিয়েই সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া ও বিতর্ক
এই ইস্যুতে রাজনৈতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। বিরোধী দলগুলির অভিযোগ, ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে নির্দিষ্ট শ্রেণির ভোটারদের বাদ দেওয়ার চেষ্টা হতে পারে।
অন্যদিকে শাসক শিবিরের বক্তব্য, নির্বাচন কমিশন একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান এবং তার কাজ স্বচ্ছভাবেই হচ্ছে। অযথা আতঙ্ক ছড়ানো হচ্ছে বলেও দাবি করা হচ্ছে।
এই টানাপড়েনের মাঝেই সাধারণ ভোটার সবচেয়ে বেশি অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন।
নির্বাচন কমিশনের অবস্থান
নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে বারবার বলা হয়েছে, চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের আগে সংশোধনের সুযোগ থাকবে। যাঁদের নাম বাদ পড়েছে বা বাদ পড়ার আশঙ্কা রয়েছে, তাঁরা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আপত্তি জানাতে পারবেন।
কমিশনের মতে, কোনও যোগ্য ভোটারকে বঞ্চিত করার উদ্দেশ্য নেই। বরং সঠিক ও নির্ভুল ভোটার তালিকা তৈরি করাই এই প্রক্রিয়ার লক্ষ্য।
তবে বাস্তবে এই আপত্তি জানানোর প্রক্রিয়া কতটা সহজ, তা নিয়েই প্রশ্ন উঠছে।
সাধারণ ভোটার কী করবেন
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হল, সাধারণ ভোটারের করণীয় কী।
প্রথমত, নিজের নাম ভোটার তালিকায় আছে কি না, তা নিয়মিত যাচাই করা জরুরি।
দ্বিতীয়ত, যদি নাম বাদ পড়ে বা ভুল তথ্য থাকে, তাহলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সংশোধনের আবেদন করতে হবে।
তৃতীয়ত, পরিচয় ও ঠিকানা সংক্রান্ত নথি হাতের কাছে রাখা প্রয়োজন।
অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, স্থানীয় স্তরে সচেতনতা না বাড়লে বহু মানুষ শেষ মুহূর্তে সমস্যায় পড়তে পারেন।
গ্রামীণ ও শহুরে ভোটার তালিকার পার্থক্য
গ্রামীণ এলাকায় মানুষ তুলনামূলকভাবে স্থায়ীভাবে বসবাস করেন। ফলে সেখানে ভোটার যাচাই প্রক্রিয়া কিছুটা সহজ হয়।
কিন্তু শহরে এই চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। একই বাড়িতে একাধিক পরিবার, ভাড়াটে বাসিন্দা, অফিসিয়াল ঠিকানা ও বাস্তব ঠিকানার ফারাক সব মিলিয়ে জটিলতা বাড়ে।
এই কারণেই ভবানীপুরের মতো শহুরে কেন্দ্রে ভোটার বাদ পড়ার আশঙ্কা বেশি বলে মনে করছেন অনেকেই।
গণতন্ত্রের দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি কতটা গুরুত্বপূর্ণ
ভোটাধিকার গণতন্ত্রের মৌলিক অধিকার। একজন যোগ্য নাগরিক যদি শুধুমাত্র প্রশাসনিক জটিলতার কারণে ভোট দেওয়ার সুযোগ হারান, তাহলে তা গণতন্ত্রের জন্য উদ্বেগের বিষয়।
৫৮ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ পড়ার আশঙ্কা যদি বাস্তবে রূপ নেয়, তাহলে তা রাজ্যের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎকেও প্রভাবিত করতে পারে।
এই কারণেই বিষয়টি শুধু একটি প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নয়, বরং সামাজিক ও রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও অত্যন্ত সংবেদনশীল।
আগেও কি এমন বিতর্ক হয়েছে
ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে পশ্চিমবঙ্গে আগেও বিতর্ক হয়েছে। অতীতে বিভিন্ন সময় নাম বাদ পড়া, ভুল ঠিকানা, একাধিক জায়গায় নাম থাকা নিয়ে অভিযোগ উঠেছে।
তবে এবারের বিতর্কের পরিসর ও সংখ্যার আশঙ্কা অনেক বেশি হওয়ায় বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতামত
নির্বাচনী প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষকদের মতে, SIR প্রয়োজনীয় হলেও তা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা জরুরি।
তাঁদের মতে, প্রযুক্তির পাশাপাশি মাঠপর্যায়ের মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি না থাকলে এই ধরনের সমস্যা বাড়ে। শুধু কাগজপত্রের উপর নির্ভর না করে বাস্তব পরিস্থিতি বোঝাও জরুরি।
উপসংহার
Bengal SIR Row ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্ক পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে নতুন করে ভোটাধিকার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। ভবানীপুরে ৪৪ হাজার ৭৮৫ জন এবং রাজ্যজুড়ে ৫৮ লক্ষের বেশি ভোটারের নাম বাদ পড়ার আশঙ্কা সত্যি হলে তার প্রভাব সুদূরপ্রসারী হতে পারে।
তবে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। এই মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি বিষয় হল সচেতনতা, স্বচ্ছতা এবং সময়মতো সংশোধনের সুযোগ।
গণতন্ত্রের শক্তি মানুষের ভোটে। সেই ভোটাধিকার যাতে কোনওভাবেই অকারণে খর্ব না হয়, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা।
Know more news: SIR in West Bengal: সময় বাড়ল ভোটার তালিকায় সংশোধনে: কেন বাড়ল, কী হবে এবং কী লাভ হবে?

হ্যালো! আমি Samapti, একজন ক্রিয়েটিভ কনটেন্ট নির্মাতা এবং ডিজিটাল স্টোরিটেলার। আমি আইডিয়াগুলোকে এমনভাবে উপস্থাপন করতে পছন্দ করি, যাতে কেবল তথ্যপূর্ণ নয়, পাঠকের জন্য আকর্ষণীয় এবং সহজে বোধ্যও হয়।

2 Comments