Lionel Messi in Kolkata

Lionel Messi in Kolkata:বিশ্বমঞ্চে কলকাতার মাথা হেঁট, মেসি ইভেন্টে অযোগ্যতা, বিশৃঙ্খলা এবং লজ্জার অধ্যায়

কলকাতা মানেই ফুটবল। কলকাতা মানেই আবেগ। কলকাতা মানেই গ্যালারির গর্জন, রাস্তার মোড়ে মোড়ে তর্ক, আর পাড়ার চায়ের দোকানে রাতভর খেলোয়াড় তুলনা। এই শহর নিজেকে বারবার পরিচয় দিয়েছে ফুটবলপাগল শহর হিসেবে। সেই কলকাতার মাটিতে যখন লিওনেল মেসির নাম জড়িয়ে যায়, তখন প্রত্যাশা স্বাভাবিকভাবেই আকাশছোঁয়া হয়।

কিন্তু বাস্তবতা প্রত্যাশার ধারেকাছেও পৌঁছল না। বরং যা ঘটল, তা কলকাতার ফুটবল ইতিহাসে এক অস্বস্তিকর, লজ্জাজনক অধ্যায় হয়ে রয়ে যাবে। বিশ্বমঞ্চে যেখানে কলকাতার মাথা উঁচু হওয়ার কথা ছিল, সেখানে শহরের অযোগ্যতা, অব্যবস্থা এবং দায়িত্বজ্ঞানহীনতার ছবি ছড়িয়ে পড়ল সর্বত্র।

এই ঘটনা শুধুই একটি ব্যর্থ ইভেন্ট নয়। এটি আমাদের ব্যবস্থাপনা, সংস্কৃতি এবং বাস্তবতার সঙ্গে স্বপ্নের ফারাকের এক নির্মম আয়না।

মেসি নামটাই যেখানে স্বপ্ন

লিওনেল মেসি কোনও সাধারণ ফুটবলারের নাম নয়। তিনি একটি যুগ, একটি আবেগ, কোটি কোটি মানুষের স্বপ্নের প্রতীক। আর্জেন্টিনার জার্সিতে বিশ্বকাপ জয়ের পর মেসি শুধু একজন খেলোয়াড় নন, তিনি ইতিহাস।

কলকাতার মতো শহরে মেসির নাম উচ্চারিত হওয়া মানেই বিশ্ব ফুটবলের মানচিত্রে শহরের নাম জ্বলজ্বল করা। এ শহর আগেও পেলে, মারাদোনার মতো কিংবদন্তিকে দেখেছে। সেই ঐতিহ্যকে সামনে রেখে মেসি ইভেন্ট মানে ছিল এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত।

কিন্তু এই সুযোগকে সম্মানের সঙ্গে সামলানোর মতো প্রস্তুতি কি আদৌ ছিল?

পরিকল্পনার শুরুতেই ফাঁক

যে কোনও আন্তর্জাতিক ইভেন্টের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল পরিকল্পনা। কিন্তু এই ইভেন্টে শুরু থেকেই ছিল অস্পষ্টতা। কোথায় হবে, কীভাবে হবে, কারা থাকবে, দর্শক কীভাবে অংশ নেবে—এই মৌলিক প্রশ্নগুলোর উত্তর শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত পরিষ্কার ছিল না।

কলকাতার মতো শহরে, যেখানে ট্রাফিক, ভিড় এবং নিরাপত্তা সবসময়ই বড় চ্যালেঞ্জ, সেখানে এমন একটি ইভেন্ট আয়োজন করতে হলে দরকার ছিল অত্যন্ত সুপরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল, পরিকল্পনা ছিল কাগজে কলমে, মাটিতে নয়।

অব্যবস্থাপনার নগ্ন ছবি

ইভেন্টের দিন যা ঘটেছে, তা শুধু বিশৃঙ্খলা নয়, বরং প্রশাসনিক ব্যর্থতার উদাহরণ। প্রবেশপথে ভিড় সামলানোর কোনও স্পষ্ট ব্যবস্থা ছিল না। টিকিট সংক্রান্ত বিভ্রান্তি, আমন্ত্রিত অতিথিদের সঙ্গে সাধারণ দর্শকের মিশে যাওয়া, নিরাপত্তা বলয়ের দুর্বলতা—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।

অনেকেই বহু দূর থেকে এসেছিলেন, কেউ উত্তরবঙ্গ থেকে, কেউ আবার জেলার প্রত্যন্ত এলাকা থেকে। আশা ছিল জীবনের এক স্মরণীয় মুহূর্ত দেখার। কিন্তু তাঁদের প্রাপ্তি ছিল ধাক্কাধাক্কি, হতাশা আর অপমান।

নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন

বিশ্বমানের একজন তারকার উপস্থিতি মানেই নিরাপত্তার প্রশ্ন অত্যন্ত সংবেদনশীল। কিন্তু এখানে সেই বিষয়টিই সবচেয়ে বেশি প্রশ্নের মুখে পড়েছে।

যে শহর একসময় আন্তর্জাতিক ফুটবল ম্যাচ আয়োজন করেছে, সেই শহরে মেসির মতো একজন ব্যক্তিত্বকে ঘিরে নিরাপত্তা ব্যবস্থার এই অবস্থা কীভাবে সম্ভব—এই প্রশ্ন আজও উত্তরহীন।

নিরাপত্তা শুধু তারকার জন্য নয়, দর্শকদের জন্যও। কিন্তু বহু জায়গায় দেখা গেছে, সাধারণ মানুষ কার্যত নিজের ভাগ্যের উপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল।

কলকাতার ভাবমূর্তির ধাক্কা

এই ঘটনা শুধু একটি ইভেন্টের ব্যর্থতা নয়। এটি কলকাতার আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির উপর বড় আঘাত। সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া ভিডিও, ছবি এবং অভিজ্ঞতার বর্ণনা শহরের ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।

যে কলকাতা নিজেকে সংস্কৃতি ও ক্রীড়ার শহর বলে গর্ব করে, সেই শহরের নাম এবার উচ্চারিত হল বিশৃঙ্খলা আর অযোগ্যতার প্রসঙ্গে।

বিশ্ব যখন দেখছে, তখন প্রশ্ন উঠছে—কলকাতা কি সত্যিই বড় আন্তর্জাতিক ইভেন্ট আয়োজনের জন্য প্রস্তুত?

ফুটবলপ্রেমী শহরের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা

সবচেয়ে কষ্টের জায়গা হল, এই ইভেন্টের মাধ্যমে কলকাতার ফুটবলপ্রেমীদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা হয়েছে। এই শহরের মানুষ ফুটবলকে ধর্মের মতো মানে। মোহনবাগান, ইস্টবেঙ্গল, মহামেডান—এই নামগুলো শুধু ক্লাব নয়, আবেগ।

সেই আবেগকে পুঁজি করে একটি আন্তর্জাতিক ইভেন্টের প্রচার করা হল, কিন্তু তার বদলে যা দেওয়া হল, তা হতাশা ছাড়া কিছুই নয়।

অনেক তরুণ, অনেক শিশু জীবনের প্রথম আন্তর্জাতিক ফুটবল আইকনের সাক্ষাৎ পাওয়ার স্বপ্ন দেখেছিল। সেই স্বপ্ন ভেঙে গেল অব্যবস্থাপনার ভারে।

দায়িত্ব কার

এই প্রশ্ন এড়ানো যায় না। এত বড় ব্যর্থতার দায় কার উপর পড়বে? আয়োজক সংস্থা, প্রশাসন, স্পনসর, না কি সকলেই দায় এড়াতে ব্যস্ত থাকবে?

বাংলায় বহুবার দেখা গেছে, কোনও বড় ইভেন্ট ব্যর্থ হলে দায় চাপানোর খেলাই শুরু হয়। কিন্তু এই ক্ষেত্রে দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। কারণ ক্ষতিটা শুধু আর্থিক নয়, এটি বিশ্বাসের ক্ষতি।

অতীত থেকে শিক্ষা নেওয়া হল না কেন

কলকাতা নতুন করে আন্তর্জাতিক ইভেন্ট আয়োজন করছে, এমনটা নয়। অতীতে বহু বড় ম্যাচ, কনসার্ট, অনুষ্ঠান হয়েছে। প্রতিবারই কিছু না কিছু সমস্যা দেখা দিয়েছে। কিন্তু সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়ার কোনও চেষ্টাই কি করা হয়নি?

একই ভুল, একই অব্যবস্থা, একই শেষ মুহূর্তের তাড়াহুড়ো—সব মিলিয়ে মনে হয়, আমরা এখনও পরিকল্পনার গুরুত্ব বুঝে উঠতে পারিনি।

মিডিয়ার ভূমিকা

এই ইভেন্ট ঘিরে মিডিয়ার ভূমিকাও প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়। আগাগোড়া এক ধরনের অতিরঞ্জিত প্রচার চলেছে। বাস্তব পরিস্থিতি, সীমাবদ্ধতা কিংবা ঝুঁকির কথা সামনে আনা হয়নি।

ফলে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা এমন জায়গায় পৌঁছেছিল, যেটা বাস্তবে পূরণ করার মতো প্রস্তুতি আদৌ ছিল না।

শুধু সমালোচনা নয়, আত্মসমালোচনা দরকার

এই ঘটনার পর শুধুই ক্ষোভ প্রকাশ করলে হবে না। দরকার আত্মসমালোচনা। কলকাতা কি সত্যিই আন্তর্জাতিক মানের ইভেন্ট আয়োজনের জন্য মানসিক ও প্রশাসনিকভাবে প্রস্তুত?

আমরা কি এখনও আবেগ দিয়ে সবকিছু সামলাতে চাইছি, পেশাদারিত্ব দিয়ে নয়?

ভবিষ্যতের জন্য শিক্ষা

এই লজ্জার অধ্যায় যদি কিছু শেখায়, তবে সেটাই হবে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। ভবিষ্যতে যদি কলকাতা আবার কোনও আন্তর্জাতিক তারকাকে আমন্ত্রণ জানাতে চায়, তাহলে আগে নিশ্চিত করতে হবে—

পরিকল্পনা বাস্তবসম্মত
দর্শকের সংখ্যা অনুযায়ী পরিকাঠামো
নিরাপত্তার প্রশ্নে কোনও আপস নয়
স্বচ্ছ তথ্যপ্রবাহ
এবং সর্বোপরি পেশাদার ব্যবস্থাপনা

শেষ কথা

লিওনেল মেসির নামের সঙ্গে যুক্ত এই ইভেন্ট কলকাতার ফুটবল ইতিহাসে গর্বের নয়, বরং লজ্জার স্মৃতি হয়ে রইল। এটি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল, শুধু আবেগ থাকলেই হয় না, দায়িত্ব আর যোগ্যতাও দরকার।

কলকাতা এখনও ফুটবলের শহর। সেই পরিচয় কেউ কেড়ে নিতে পারবে না। কিন্তু সেই পরিচয় ধরে রাখতে হলে, ভবিষ্যতে এমন ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নেওয়াই একমাত্র পথ।

কারণ বিশ্বমঞ্চে আর একবার মাথা হেঁট হওয়ার মতো বিলাসিতা কলকাতার নেই।

Know more news: Ind vs Sa 1st ODI:ব্যাটে RO-KO, বলে কুলদীপ, ১৭ রানে জয় টিম ইন্ডিয়ার

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *