অমিতাভ বচ্চনের নাম, ছবি বা কণ্ঠ আর অনুমতি ছাড়া নয়: দিল্লি হাইকোর্টের স্থায়ী নিষেধাজ্ঞার বড় প্রভাব
বলিউডের কিংবদন্তি অভিনেতা অমিতাভ বচ্চনের নাম, ছবি, কণ্ঠস্বর বা তাঁর ব্যক্তিসত্তার অন্য কোনো অংশ আর অনুমতি ছাড়া বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহার করা যাবে না। দিল্লি হাইকোর্ট সম্প্রতি এই মর্মে একটি স্থায়ী নিষেধাজ্ঞামূলক রায় (permanent injunction) দিয়েছে, যা ২০২২ সালে অভিনেতার করা মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি। বিচারপতি পুরুষেন্দ্র কুমার কৌরবের বেঞ্চ ৫ নভেম্বর এই আদেশ দেন। এর ফলে ২০২২ সালের নভেম্বরে দেওয়া অন্তর্বর্তী নিষেধাজ্ঞা এখন স্থায়ী রূপ পেল, এবং ভবিষ্যতে কেউ যদি অনুমতি ছাড়া অমিতাভ বচ্চনের পরিচয় ব্যবহার করে ব্যবসা করতে চায়, তাহলে আইনি পদক্ষেপের মুখে পড়বে।
মামলার পটভূমি
২০২২ সালে অমিতাভ বচ্চন দিল্লি হাইকোর্টে একটি মামলা করেন। অভিযোগ ছিল, বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান তাঁর নাম, ছবি বা কণ্ঠস্বর ব্যবহার করে ব্যবসা চালাচ্ছে—কেউ মোবাইল অ্যাপ বানিয়েছে, কেউ কুইজ বই প্রকাশ করেছে, কেউ পোস্টার বা টি-শার্ট বিক্রি করেছে, আবার কেউ তাঁর নামে ডোমেইন নাম কিনেছে। অভিনেতার আইনজীবীরা argued যে এসব ব্যবহারে তাঁর সম্মতি ছিল না এবং এতে তাঁর সুনামের ক্ষতি হচ্ছে, পাশাপাশি জনগণ বিভ্রান্ত হচ্ছে যে তিনি ওই পণ্য বা সেবার সঙ্গে যুক্ত। আদালত প্রাথমিকভাবে ২৫ নভেম্বর, ২০২২-এ একটি অন্তর্বর্তী নিষেধাজ্ঞা দেয়, যা ওই সময় থেকে কার্যকর ছিল। এবার সেই নিষেধাজ্ঞাই স্থায়ী করা হলো।
আট বিবাদী ও দুই ধরনের রায়
এই মামলায় মোট আটজন বিবাদী ছিলেন। তাঁদের মধ্যে চারজন—রজত নাগি (যিনি ‘অমিতাভ বচ্চন ভিডিও কল’ নামের একটি মোবাইল অ্যাপ বানিয়েছিলেন), মনোজ পাবলিকেশন্স (যারা তাঁর ছবি দেওয়া একটি সাধারণ জ্ঞান কুইজ বই প্রকাশ করেছিল), তামাতিনা (যারা তাঁর ছবি দেওয়া পোস্টার বিক্রি করত) এবং মহেশ প্যাটেল (যিনি amitabhbachchan.in ডোমেইন নামটি নিবন্ধন করেছিলেন)—অভিনেতার সঙ্গে সমঝোতা করেন। তাঁরা অমিতাভ বচ্চনের পাবলিকিটি ও প্রাইভেসি অধিকার স্বীকার করে নেন এবং ভবিষ্যতে অনুমতি ছাড়া তাঁর নাম, ছবি, কণ্ঠ বা ব্যক্তিসত্তার কোনো অংশ ব্যবহার না করার প্রতিশ্রুতি দেন। সমঝোতার শর্ত অনুযায়ী তাঁরা সংশ্লিষ্ট অ্যাপ, বই, পোস্টার বা ডোমেইন নামও সরিয়ে নেন বা বন্ধ করে দেন, এবং অভিনেতা তাদের বিরুদ্ধে ক্ষতিপূরণের দাবি ছেড়ে দেন।
অপর চারজন বিবাদী—যাঁরা আদালতে হাজির হননি বা লিখিত জবাব দেননি—তাঁদের বিরুদ্ধে আদালত সিভিল প্রসিডিউর কোডের (CPC) অর্ডার VIII রুল ১০ অনুযায়ী রায় দেয়। আদালত মনে করেছে, এই মামলায় তথ্য নিয়ে কোনো বাস্তব বিতর্ক নেই, তাই দীর্ঘ বিচারের প্রয়োজন নেই। ফলে তাদের বিরুদ্ধেও স্থায়ী নিষেধাজ্ঞা জারি হয়।
শুধু নাম, কণ্ঠস্বর ও ব্যক্তিসত্তাও সুরক্ষিত
এই রায়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, আদালত স্পষ্ট করেছে যে শুধু নাম বা ছবি নয়, অভিনেতার কণ্ঠস্বর, তাঁর অনন্য ভঙ্গি বা ব্যক্তিসত্তার অন্য যেকোনো উপাদানও তাঁর সম্মতি ছাড়া বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করা যাবে না। আদালত পর্যবেক্ষণে বলেছে, “বিবাদীদের ব্যবহারে অভিনেতার নাম ও ছবি ব্যবসায়িক লাভের জন্য এবং তাঁর সম্মতি ছাড়া ব্যবহার করা হয়েছে, যা ভুলভাবে তাঁর সমর্থনের ইঙ্গিত দেয়।” এই পর্যবেক্ষণ ভবিষ্যতে সেলিব্রিটি এন্ডোর্সমেন্ট সংক্রান্ত মামলার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ নজির হয়ে থাকবে।
‘জন ডো’ আদেশ: অজ্ঞাত অপরাধীদের বিরুদ্ধেও কার্যকর
আদালত এই রায়কে শুধু আটজন বিবাদীর মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেনি। যেহেতু ডিজিটাল মাধ্যমে অজ্ঞাত ব্যক্তিরা সহজেই অন্যের পরিচয় ব্যবহার করে প্রতারণা বা ব্যবসা করতে পারে, তাই আদালত ‘জন ডো’ (John Doe) বা ‘অশোক কুমার’ (Ashok Kumar) নামে পরিচিত আদেশের আওতায় অজ্ঞাত infringers-দের বিরুদ্ধেও এই নিষেধাজ্ঞা বাড়িয়ে দিয়েছে। এর মানে হলো, ভবিষ্যতে যদি কেউ অমিতাভ বচ্চনের নাম বা ছবি ব্যবহার করে নতুন কোনো অ্যাপ, ওয়েবসাইট, পোস্টার বা মেসেজিং প্ল্যাটফর্মে প্রতারণা করে, তাহলে অভিনেতা সরাসরি তাদের বিরুদ্ধে আদালতে যেতে পারবেন, নতুন মামলা করতে পারবেন এবং আদালতের আদেশ কার্যকর করতে পারবেন। এটি সেলিব্রিটিদের জন্য একটি বড় সুরক্ষা, কারণ অজ্ঞাত অপরাধীদের আগে থেকে চিহ্নিত করা সম্ভব হয় না।
কেন এই রায় গুরুত্বপূর্ণ
ভারতে ব্যক্তিত্বের অধিকার (personality rights) বা পাবলিকিটি রাইটস নিয়ে মামলা সাধারণত অন্তর্বর্তী আদেশেই শেষ হয়ে যায়। অনেক ক্ষেত্রে অভিনেতা বা ক্রীড়াবিদরা প্রাথমিক নিষেধাজ্ঞা পান, কিন্তু মামলা চূড়ান্ত রায় পর্যন্ত গড়ায় না। অমিতাভ বচ্চনের এই মামলাটি সেই দিক থেকে ব্যতিক্রম—এটি চূড়ান্ত ডিক্রি (decree) পর্যন্ত পৌঁছেছে। এর মাধ্যমে ভবিষ্যতে অন্য তারকারাও যদি অনুরূপ পরিস্থিতিতে পড়েন, তাহলে এই রায়কে নজির হিসেবে ব্যবহার করতে পারবেন। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই রায় ডিজিটাল যুগে সেলিব্রিটি ও জনপ্রিয় ব্যক্তিদের পরিচয় সুরক্ষার ক্ষেত্রে একটি শক্তিশালী বার্তা দিয়েছে।
অভিনেতার পক্ষে কারা ছিলেন
এই মামলায় অমিতাভ বচ্চনের পক্ষে সিনিয়র অ্যাডভোকেট সন্দীপ শেঠি ছাড়াও অ্যাডভোকেট প্রবীণ আনন্দ, অমিত নায়েক, মধু গদোদিয়া, ধ্রুব আনন্দ, ভাব্য বর্মা, উন্নতি গাম্বানি, সঞ্জীবি সিশাদ্রি, শ্রেয়া শেঠি, কৃষ্ণা গাম্বীর এবং ঋত্বিক শর্মা আদালতে উপস্থিত ছিলেন।
শেষ কথা
এই রায়ের পর অমিতাভ বচ্চনের নাম, ছবি বা কণ্ঠস্বর ব্যবহার করে পণ্য বিক্রি, অ্যাপ তৈরি, বই প্রকাশ বা ওয়েবসাইট চালানো এখন অনেক কঠিন হয়ে গেল। যে কেউ অনুমতি ছাড়া এই কাজ করলে তাঁকে আইনি পরিণতি ভোগ করতে হবে। তবে আইনি মতে, এই রায় শুধু অমিতাভ বচ্চনের জন্যই নয়, বরং ভারতের সমস্ত সেলিব্রিটি ও জনপ্রিয় ব্যক্তির ব্যক্তিত্বের অধিকার সুরক্ষার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে থাকবে।

হ্যালো! আমি Samapti, একজন ক্রিয়েটিভ কনটেন্ট নির্মাতা এবং ডিজিটাল স্টোরিটেলার। আমি আইডিয়াগুলোকে এমনভাবে উপস্থাপন করতে পছন্দ করি, যাতে কেবল তথ্যপূর্ণ নয়, পাঠকের জন্য আকর্ষণীয় এবং সহজে বোধ্যও হয়।
